খাদ্যে যখন মৃত্যুফাঁদ: স্লো-পয়জনে ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ

ফারজানা আক্তার:

মতামত

মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো খাদ্য। নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার জন্য নিরাপদ

2026-08-04T12:24:19+06:00
2026-08-04T12:24:19+06:00
মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

খাদ্যে যখন মৃত্যুফাঁদ: স্লো-পয়জনে ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ
ফারজানা আক্তার:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৬)

মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো খাদ্য। নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার জন্য নিরাপদ খাদ্যই মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই পুষ্টিকর খাবারে ভরা থালাই যেন মানুষের জন্য বিষের আধার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছে—সে আসলে অদূর ভবিষ্যতে কীভাবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে যে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা হয়, সেখান থেকে শুরু করে সারাদিনের প্রতিটি খাদ্যদ্রব্য ও রান্নার উপকরণে যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে এক অদৃশ্য মরণজাল। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস কিংবা শিশুখাদ্য—কোথাও নিস্তার নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ যা প্রতিদিন গ্রহণ করছে, তাতে লুকিয়ে আছে বিষাক্ততার থাবা। বাস্তবে মানুষ এখন আর প্রতিদিন পুষ্টি গ্রহণ করছে না, বরং নিয়মিতভাবে গ্রহণ করছে স্লো-পয়জন বা ধীরগতির বিষ।

পুষ্টির যোগান দেওয়ার পরিবর্তে নিত্যদিনের বাজার থেকে সংগৃহীত খাদ্যদ্রব্য এখন কোটি মানুষের দেহে নীরবে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে খাদ্য বিষক্রিয়া ও খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির একটি বহুল আলোচিত গবেষণার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের সাধারণ বাজারে বিক্রিত ফলমূলের ৮০ শতাংশ, শাকসবজির ৬০ শতাংশ এবং চাল ও ভোজ্যতেলের ৭০ শতাংশেরও বেশি মারাত্মক রাসায়নিক ও ভেজালে দূষিত। শিশু থেকে বৃদ্ধ—কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না এই অদৃশ্য ঘাতক। প্রাকৃতিক খাবারের মৌলিক গুণাগুণ ও পুষ্টিমান নষ্ট করে মুনাফালোভী একটি চক্র তাতে মেশাচ্ছে শিল্পকারখানার বিষাক্ত রং, টেক্সটাইল কালার, ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও কার্সিনোজেনিক উপাদান ফরমালিন। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্লাস্টিক দূষণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং টুথপেস্টের মতো নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীতেও ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ না বুঝেই বাজার থেকে যা কিনছে, তা মূলত খাদ্যের ছদ্মবেশে এক প্রকার কৃত্রিম বিষ। এই বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে শরীরে জমতে জমতে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে, যার ফলে অকালে কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারের মতো জটিল অসংক্রামক রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিষাক্ত খাদ্যের এই ভয়াল আক্রমণের বিপরীতে নাগরিকদের সুরক্ষায় দাঁড়ানোর কথা ছিল যে স্বাস্থ্যসেবা খাতের, তা নিজেই নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। ভেজাল খাবারের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে, অন্যদিকে অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর কারণে জনস্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে। অর্থাৎ যে বিষাক্ত খাদ্যব্যবস্থা সাধারণ নাগরিককে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার হাত থেকে বাঁচতে গিয়েও মানুষ ভঙ্গুর চিকিৎসাব্যবস্থার কাছে কোনো নিশ্চিত আশ্রয় পাচ্ছে না। যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

এই সমস্যার রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়, তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিটি বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে খাবারের গুণমান পরীক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি, অসাধু চর্চা বন্ধে ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের নৈতিকতা চর্চা এবং নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। সর্বোপরি, ভেজাল খাদ্য চেনার উপায় ও অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতন করা এবং নিরাপদ খাদ্যের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে বাজারের বিষাক্ত খাবার কার্যকরভাবে নির্মূল করা সম্ভব।

বাজারের বিষাক্ত ও ভেজাল খাবার নির্মূল করতে সমন্বিত আইনি, প্রশাসনিক ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত রাসায়নিক, কৃত্রিম রং বা ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী পদার্থের প্রয়োগ বন্ধে নিরাপদ খাদ্য আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি নজরদারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিত বাজারে গিয়ে আকস্মিক পরিদর্শন ও রাসায়নিক পরীক্ষা চালিয়ে ভেজাল পণ্যের উৎস চিহ্নিত করে তা তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ ও ধ্বংস করতে হবে। এই ভয়াবহ ভেজাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বা সামাজিক তৎপরতা যতই বাড়ুক না কেন, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য শক্তিকে উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের জীবনকে জিম্মি করে কারা এই বিষ-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, কোন অদৃশ্য ছায়াতলে এরা পার পেয়ে যাচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে অশুভ চক্রকে উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নয়তো ভেজালের এই নীল বিষে একদিন থমকে যাবে গোটা একটি জাতি। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক যেন খাদ্যের মতো প্রধান মৌলিক চাহিদার ঘাটতিতে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সোচ্চার হতে হবে—তবেই সুস্থতায় গড়ে উঠবে আগামীর প্রজন্ম।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ।

ডেল্টা টাইমস/ফারজানা আক্তার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ