প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৭ এএম (ভিজিট : ৫)

ফ্রান্স ও স্পেনের দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও প্রবল বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বনাঞ্চল, জনপদ ও বিস্তীর্ণ পর্যটন এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে ফ্রান্স। অন্যদিকে স্পেন জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তাও চেয়েছে দুই দেশ।
ফ্রান্সে ২ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে দাবানল সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে প্রায় ২ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোর্দোর আশপাশ থেকে নতুন করে প্রায় ৬০ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দাবানল মোকাবিলায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছেন।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপও পুরোপুরি খালি করা হয়েছে। অনেক মানুষ নৌকায় করে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। সারা বছর সেখানে প্রায় ৮ হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও গ্রীষ্মের ছুটির মৌসুমে জনসংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়ে যায়।
দমকল বাহিনীর প্রধান মার্ক ভারম্যুলেন বলেন, ২০২২ সালের ভয়াবহ দাবানলের চেয়েও এবার পরিস্থিতি বেশি বিপজ্জনক। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে আগুন রাতেও অব্যাহতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘এত বড় আকারের দাবানল আমরা আগে কখনো দেখিনি।’
জিরন্দ অঞ্চলে ইতোমধ্যে ১৯ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে এবং অন্তত ৮০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ বলেন, আগুন বারবার দিক পরিবর্তন করছে। আগুন যাতে বোর্দো শহরের দিকে অগ্রসর হতে না পারে, সে জন্য নতুন কৌশলে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত আগুন নেভানোর কাজে অন্তত ৫০ জন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন।
স্পেনে জাতীয় জরুরি অবস্থা
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছে একাধিক দাবানল একত্রিত হয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিস্থিতি এখন দমকল বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটিতে অন্তত ২৫ হাজার মানুষকে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাদ্রিদ অঞ্চলে দাবানলে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ হাজারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ২০ হাজার মানুষ লকডাউনে রয়েছেন।
কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আগুনের ছাই ও জ্বলন্ত কণা কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত উড়ে যাচ্ছে এবং আগুন বড় বড় দূরত্ব অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো এটিকে অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, তীব্র তাপপ্রবাহ, প্রবল বাতাস ও বিভিন্ন দিক থেকে ছুটে আসা আগুন মিলেই এক ধরনের ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ তৈরি করেছে।
স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, দাবানল দ্রুত রবলেদো দে চাভেলা ও ফ্রেসনেদিয়াস দে লা অলিভা পৌর এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদ্রিদের আঞ্চলিক সরকারের জরুরি ব্যবস্থাপনা প্রধান কার্লোস নোভিয়ো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি আগুন নেভানো সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আগুনের বিস্তার ঠেকাতে স্পেনের সামরিক জরুরি ইউনিট (ইউএমই) মোতায়েন করা হয়েছে। একই সময়ে আভিলা প্রদেশের বুর্গোহন্দো এলাকার দাবানলের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দুটি দাবানল একত্রিত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেছেন, ‘দুটি দাবানল এক হয়ে যাওয়া ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
আভিলার এল তিয়েম্বলো এলাকার মেয়র আর্তুরো ভারাস গনসালেস জানান, নাভালুয়েঙ্গা থেকে ইরুয়েলাস উপত্যকা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ আগুন আধা ঘণ্টারও কম সময়ে অতিক্রম করেছে। তার ভাষায়, ‘দৃশ্যটি ছিল ভয়াবহ।’
এ পর্যন্ত মাদ্রিদ অঞ্চলে অন্তত ৬ হাজার হেক্টর এবং আভিলা প্রদেশে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে।
মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের ৮৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ইকোলজিও কাবরেরা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আপনি যদি আগুন থেকে না পালিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করেন, তবে সেটি আপনাকে গ্রাস করে ফেলবে।’
তিনি জানান, পরিবারের সদস্যরা বাগানের পানির পাইপ দিয়ে বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। পরে দমকলকর্মীরা এসে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন।
এদিকে স্পেনের বুর্গোহন্দো এলাকার দাবানলের ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অবহেলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শনিবার সকালে জরুরি সমন্বয় কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এর আগে তিনি বলেন, দেশবাসী অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে এবং সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা
দাবানল মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজম সক্রিয় করা হয়েছে। চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া থেকে দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারসহ অতিরিক্ত সহায়তা আসছে। সূত্র: বিবিসি।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই