একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ও মেধা, কিন্তু সেই মেরুদণ্ডে যখন দুর্নীতির উইপোকা হানা দেয়, তখন সমগ্র রাষ্ট্রের কাঠামো তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন প্রযুক্তি ও সমৃদ্ধির নতুন স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে মেধা ও সৃজনশীলতার এক নীরব রক্তক্ষরণ। যে মেধাবীদের হাত ধরে দেশের রূপান্তর হওয়ার কথা ছিল, তারা আজ বিদেশের মাটিতে নিজেদের অস্তিত্বের শেকড় গাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এই মেধা পাচার কেবল উন্নত জীবনের মোহ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা, মেধার অবমূল্যায়ন এবং বিশেষ করে শিক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেঁকে বসা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। যখন একটি সমাজ মেধাকে সম্মান না দিয়ে লবিং, স্বজনপ্রীতি আর কালো টাকার কাছে মাথানিচু করে, তখন সেই সমাজ থেকে মেধার প্রস্থান কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রস্থান রাষ্ট্রকে এক মেধাশূন্য অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে উন্নয়নের বড় বড় ইমারত দৃশ্যমান হলেও তার ভেতরে বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার নিম্নমান মেধা পাচারের অন্যতম বড় প্রভাবক। উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট মধ্যবিত্ত জীবনের নিরাপত্তাহীনতা মেধাবীদের হতাশ করছে। যানজট, বায়ুদূষণ এবং নড়বড়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাঝে যখন একজন মেধাবী তার প্রাপ্য নাগরিক সম্মান ও স্বস্তিটুকু পান না, তখন তিনি বিদেশের সুশৃঙ্খল জীবনকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। এছাড়া আমাদের দেশে 'ব্রেইন গেইন' বা প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর নীতিমালা নেই; বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিদেশ থেকে ফিরে আসা বিশেষজ্ঞরাও অনেক সময় দেশে টিকতে পারেন না। বাস্তবতা হলো, ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়েও একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন বছরের পর বছর লাইব্রেরির টেবিলে মাথা কুটে প্রস্তুতি নেয় এবং পরীক্ষার পর জানতে পারে যে তার স্বপ্নের বিসিএস কিংবা সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই বিক্রি হয়ে গেছে, তখন তার ভেতরের দেশপ্রেম এক গভীর বিষাদে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতি ও প্রশ্ন ফাঁসের যে নতুন নতুন কৌশলের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া পচনকেই নির্দেশ করে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০,০০০ থেকে ৯০,০০০-এর কোঠায় পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশ আর কখনোই দেশে ফেরার চিন্তা করছে না। রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষার্থীকে তৈরি করতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়, তখন দুর্নীতির কারণে সেই মেধা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া মানে হলো জাতীয় বিনিয়োগের এক চরম অপচয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে ওঠার এই সংস্কৃতি মেধাবীদের মনে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ ও হীনম্মন্যতার জন্ম দিচ্ছে, যা তাদের পাসপোর্ট হাতে নিতে বাধ্য করছে।
মেধা পাচারের পেছনে কেবল নিয়োগের দুর্নীতিই নয়, বরং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের অভাব এবং গবেষণার সুযোগহীনতাও সমানভাবে দায়ী। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ এখনও জিডিপির ১ শতাংশের নিচে পড়ে আছে। একজন তরুণ গবেষক যখন দেখেন দেশে তার উদ্ভাবনের কোনো কদর নেই বা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা নেই, তখন তিনি বিদেশের হাতছানি এড়াতে পারেন না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বায়ুদূষণ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভীতি। একজন মেধাবী মানুষ কেবল উচ্চ বেতন চান না, তিনি চান তার জীবনের নিরাপত্তা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি। কিন্তু যখন তিনি দেখেন অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজরা ক্ষমতার দাপটে উচ্চপদে আসীন হচ্ছে এবং সৎ মেধাবীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন তিনি স্বস্তির খোঁজে প্রবাসের অচেনা পথকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। নীতিমালার খাতা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়, অন্যথায় আমাদের মেধা সম্পদ অন্যের ঘরে সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকে কেবল আশ্বাসের বাণী নয়, বরং আমূল প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। ২০২৬ সালের ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার আওতায় এনে প্রশ্ন ফাঁস ও দুর্নীতি নির্মূল করা এখন অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাত ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান ও স্টার্টআপ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, ইট-পাথরের বড় বড় প্রজেক্ট দিয়ে উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও, সেই উন্নয়ন টেকসই করার মতো দক্ষ মানুষ দেশে না থাকলে সব আয়োজনই বৃথা হবে। আমরা আমাদের সন্তানদের বিদেশের পণ্য বানাতে চাই না; আমরা চাই তারা এই মাটির সন্তান হয়ে এ দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করুক। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে একটি মেধাবী মস্তিষ্ক হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সম্ভাবনাময় সোনালি ভবিষ্যতের অপমৃত্যু। সময় এসেছে নীতি ও বাস্তবতার এই ফাঁকফোকর বন্ধ করার; অন্যথায় আগামীর বাংলাদেশ হবে দক্ষ জনশক্তিহীন এক কৃত্রিম উন্নয়নের কঙ্কাল। মেধাহীন মেগা প্রজেক্ট নয়, বরং মেধা সমৃদ্ধ বাংলাদেশই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক: আইন বিভাগ, তরুণ লেখক ও কলামিস্ট
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ডেল্টা টাইমস্/শিমলা পাল/আইইউ