মানুষ কি সত্যিই জানে, সে কিসে সুন্দর? আয়নার প্রতিচ্ছবিতে, নাকি নিজের নীরবতায়? সময়ের প্রবাহে শরীর বদলায়, বয়স রেখা আঁকে মুখে কিন্তু মানুষের সৌন্দর্য, অর্থাৎ তার মন, ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়। তাই সৌন্দর্যের প্রকৃত প্রশ্নটি কখনোই বাহ্যিক ছিল না; এটি সবসময়ই অন্তর্গত ছিল। একজন মানুষের সৌন্দর্য তার হাসিতে নয়, তার আচরণে; তার পোশাকে নয়, তার সহানুভূতিতে; তার উপস্থিতিতে নয়, তার অনুপস্থিতিতেও রেখে যাওয়া প্রভাবেই প্রকাশ পায়। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত মনে রাখা হয় তার ব্যবহার দিয়ে তার মুখশ্রীর জন্য নয়। অস্থিরতার সভ্যতায় মানসিক নীরবতার সংকট আজকের সময় এক অদ্ভুত দ্রুততার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তথ্য আসে, প্রতিক্রিয়া আসে, মতামত আসে কিন্তু শান্তি যেন আসার আগেই হারিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় আয়না, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য শব্দ জন্ম নেয়, কিন্তু বোঝাপড়ার মৃত্যু ঘটে। অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক, তীক্ষ্ণ মন্তব্য এবং প্রতিক্রিয়ার অতিরিক্ততা ধীরে ধীরে মানুষের মানসিক স্থিতি ক্ষয় করে। এই ক্ষয় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনুভবযোগ্য ঘুমের মধ্যে, নিঃশ্বাসের মধ্যে, আর নিঃশব্দ ক্লান্তির মধ্যে। মানুষ তখন আর শুধু ক্লান্ত থাকে না সে বিভ্রান্ত হয় নিজের মধ্যেই। মনের শান্তি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ফল। উদ্বেগ, চাপ ও বিষণ্নতা এই ভারসাম্যকে ধীরে ধীরে নড়বড়ে করে দেয়। অন্যদিকে, প্রশান্ত মস্তিষ্ক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, চিন্তাকে পরিশীলিত করে এবং সিদ্ধান্তকে স্থির রাখে। এই ভারসাম্য রক্ষার জন্য জীবনযাত্রার মৌলিক শৃঙ্খলা অপরিহার্য নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মানসিক বিশ্রাম। একই সঙ্গে শেখার অভ্যাস পড়া, নতুন কিছু জানা, চিন্তাকে সক্রিয় রাখা মস্তিষ্ককে জীবন্ত রাখে।
ধ্যান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন এখানে কোনো আধ্যাত্মিক বিলাসিতা নয়; এটি মানসিক টিকে থাকার একটি বাস্তব কৌশল। নেতিবাচকতা নীরব বিষ। সব নেতিবাচকতা উচ্চস্বরে আসে না; কিছু নেতিবাচকতা খুব নীরবে কাজ করে একটি সম্পর্কের মধ্যে, একটি কথার মধ্যে, কিংবা একটি অভ্যাসের মধ্যে। টক্সিক সম্পর্ক, অতিরিক্ত সামাজিক চাপ এবং আত্মসম্মান ক্ষয় করে এমন পরিবেশ এসব থেকে দূরে থাকা মানে পালিয়ে যাওয়া নয়; এটি নিজের মানসিক সীমানা রক্ষা করা। কারণ যে মানুষ নিজের শান্তিকে রক্ষা করতে পারে না, সে বাইরের পৃথিবীকেও স্থিরভাবে মোকাবিলা করতে পারে না।
নিজেকে ফেরত পাওয়ার চর্চা নিজের প্রতি যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। নিজের ইচ্ছাকে অস্বীকার করে, নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুস্থ জীবন গড়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে নিজেকে সময় দেওয়া, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের প্রতি কঠোর না হয়ে সহানুভূতিশীল হওয়া এই চর্চাগুলো মানুষকে পুনর্গঠন করে। মানুষ যখন নিজেকে শোনে, তখনই সে পৃথিবীকে সঠিকভাবে শুনতে শেখে।
স্বস্তিই প্রকৃত সৌন্দর্য। শরীর ক্ষণস্থায়ী, পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল কিন্তু শান্ত মন একটি স্থায়ী শক্তি। এটি শুধু ব্যক্তিগত সুখ নয়, এটি সামাজিক স্থিতিরও ভিত্তি।
অস্থিরতার এই সময়কালে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো সাফল্য নয় বরং নিজের মধ্যে একটি শান্ত জায়গা খুঁজে পাওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত, মানুষকে তার সৌন্দর্যে নয় তার স্বস্তিতেই চেনা যায়।
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।