বিরূপ আবহাওয়ায় ঘরে-বাইরে প্রাণীদের জন্য কিছু করার দায়িত্ব আছে আমাদের। তীব্র গরম সবার জন্যই ভীষণ কষ্টের। আমাদের মাথার ওপর ছাদ আছে, ঘরে ফ্যান আছে, হাতের নাগালে পানি আছে। পথে এসব নেই। তাই পথের প্রাণীদের জন্য কিছু করতে হবে আমাদের।
মানবতার চর্চা:বাড়ির নিচে পথের প্রাণীর জন্য পানি এবং সামান্য কিছু খাবার রাখা যেতে পারে। তবে প্রাণীদের জন্য রেখে দেওয়া পাত্রের পানি বদলে দেওয়া উচিত রোজই। পরিষ্কার করে দেওয়া উচিত পাত্রটা। তাতে পানিও খাওয়ার উপযোগী থাকে আর মশা জন্মানোর ভয়ও থাকে না। খাবার দেওয়ার পরও একইভাবে জায়গাটা পরিষ্কার করে রাখতে হবে। বারান্দা বা ছাদেও পাখিদের জন্য পানি রেখে দেওয়া যেতে পারে। একটু ছায়ার খোঁজে আসা প্রাণীরা ভয় বা আঘাত পায়, এমন কিছু করা উচিত নয় কারও।
যে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না:* বাড়িতে অনেকেই প্রাণী পোষেন। এই প্রাণীরা পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভরশীল।
* পোষা প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখুন তার নাগালের মধ্যেই। দু-তিন বেলা পানি বদলে দেওয়াও জরুরি। তা ছাড়া পানিতে ময়লার হালকা স্তর পড়লেও সঙ্গে সঙ্গে পানি বদলে দিন। পাত্রটি পরিষ্কার করুন রোজ। ওরস্যালাইন বা গ্লুকোজ-পানি দেবেন না। কেবল বমি বা পাতলা পায়খানা হলে সামান্য ওরস্যালাইন দেওয়া যায়। কোন প্রাণীকে কতটুকু স্যালাইন দেওয়া যায়, তা জেনে নিন প্রাণী চিকিৎসকের কাছে।
* বিড়াল- কুকুরদের শুকনা খাবার কম দিতে চেষ্টা করুন। এক বেলার বেশি শুকনা খাবার না দেওয়াই ভালো। সেদ্ধ ঝোলজাতীয় খাবার সবচেয়ে ভালো। কোনো মসলা দেবেন না। কখনো কখনো প্যাকেটজাত বা টিনজাত খাবার দিলে ভেজা খাবার (ওয়েট ফুড) বেছে নিন।
* ওয়েট ফুড এবং রান্না করা খাবার নষ্ট হয় গরমে। তাই ফ্রিজে রাখুন। তবে ওয়েট ফুড গরম করা যায় না। তাই খাওয়ানোর খানিকক্ষণ আগে বের করে নিন।
* গরমের সময় মাঝে মধ্যে প্রাণীদের মাথায় ভেজা হাত বুলিয়ে দিন, শরীর আর থাবা মুছে দিন নরম ভেজা কাপড় দিয়ে। খরগোশের ক্ষেত্রে অন্তত তিন-চারবার অবশ্যই এমনটা করুন। যেকোনো প্রাণীর শরীর গরম হলেও এই পদ্ধতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিন। তবে ঠান্ডা পানি নয়, স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করবেন সব সময়। কখনোই যেন কানে পানি না ঢোকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* গরমে সব পশু পাখিকে তিন-চার দিন অন্তর গোসল করিয়ে দিন। শ্যাম্পু করাতে হলে ওদের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন। ওরা যদি এসির হাওয়ায় থাকার সুবিধা পায়, তাহলে পাঁচ-সাত দিন অন্তর গোসল করানোই যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে রোজ একাধিকবার গা-মাথা ভেজানোর প্রয়োজনও নেই।
* কিছু বিদেশি প্রাণীর লম্বা লোম থাকে। পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লোম ছাঁটানো যেতে পারে।
* যেসব প্রাণী মেঝেতে বসে থাকে, তাদের বসার জায়গাগুলো রোজ দু-তিনবার পানি দিয়ে মুছে দেওয়া ভালো।
* খেয়াল রাখুন, প্রাণী যেন কোনো ফ্যানের নাগাল না পায়।
* প্রাণীদের বাইরে নিতে হলে এমন সময় বেছে নিন, যখন তাপমাত্রা তুলনামূলক কম।
* প্রাণীকে গাড়িতে একা রেখে কোথাও যাবেন না। গরমের সময় পোষা প্রাণীকে বন্ধ গাড়ির মধ্যে কোনোভাবেই রাখা যাবে না। খুব প্রয়োজনে রাখতে হলে এসি চালিয়ে অথবা সব জানলা খোলা রাখতে হবে। তাপপ্রবাহে প্রাণীদের হিটস্ট্রোক হতে পারে।
* বাড়িতে বা এলাকায় কোনো প্রাণী খাওয়া দাওয়ায় আগ্রহ হারালে কিংবা অসুস্থতার অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এলাকাভিত্তিক উদ্যোগে পথের প্রাণীদেরও টিকা দিয়ে রাখা ভালো। তাতে প্রাণী এবং মানুষ সবাই নিরাপদ থাকবে। তবে গরমে কোনো প্রাণীর টিকা দেওয়ার আগে প্রাণী চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে নেওয়া প্রয়োজন।
এই গরমে কী করবো?পাখির জন্য:
১. খাঁচা ছায়ায় রাখুন।
২. ঠাণ্ডা পানি ও ফল দিন।
৩. ক্লান্তি দেখলে ব্যবস্থা নিন।
কুকুর-বিড়ালের জন্য:১. ঠাণ্ডা পরিবেশে রাখুন।
২. শরীরে পানি ছিটিয়ে দিন।
৩. পানি মিশ্রিত হালকা খাবার দিন।
৪. হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
বিশেষ টিপস:১. দুপুর ১১টা থেকে ৪টা : বাইরে আনবেন না।
২. খাঁচার নিচে ভেজা কাপড় দিন।
৩. বিকেলে ছায়া-আলোয় খেলাধুলার সুযোগ দিন।
** হিটস্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিকার:পোষা প্রাণীরা গরমে হিটস্ট্রোকের শিকার হতে পারে, যা জীবনঘাতী হতে পারে। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে :
১. অতিরিক্ত হাঁপানো ও লালা ঝরানো।
২. লাল বা ফ্যাকাশে মাড়ি।
৩. দুর্বলতা, বমি, বা খিঁচুনি।
এমন লক্ষণ দেখা দিলে, পোষা প্রাণীকে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান, ঠান্ডা (কিন্তু বরফ- ঠান্ডা নয়) পানি পান করান এবং শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালুন। এরপর দ্রুত প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
চুল যত্নে রাখুন:লম্বা লোমওয়ালা বিড়াল (যেমন পার্সিয়ান) হলে গরমে বেশি কষ্ট পায়।
নিয়মিত ব্রাশ করে অতিরিক্ত লোম ঝরিয়ে দিন।
প্রয়োজনে পশু চিকিৎসকের পরামর্শে হালকা ট্রিম করাতে পারেন। এতে শরীর ঠান্ডা থাকবে ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে।
পানি খাওয়াতে উৎসাহ দিন:বিড়ালরা কম পানি খায়, যা গরমে বিপজ্জনক। অনেকটা পানি খাওয়াতে চাইলে চলন্ত পানি (cat water fountain) ব্যবহার করুন। এতে শরীর ঠান্ডা থাকবে ।
সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখুন:জানালার পাশে সূর্যের আলো পড়ে এমন জায়গায় ঘুমানো বিপজ্জনক হতে পারে। খেয়াল রাখুন ও যেন গরম জানালায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা না ঘুমায়। না হলে শরীর গরমে হয়ে হিট স্ট্রোক এর শিকার হবে।
পানি শূন্যতায় ও ডায়রিয়ায় করণীয়:১. চরম গরমে ডিহাইড্রেশনে ভোগে প্রাণীরাও। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গিয়ে মারাত্মক অসুস্থ হতে পারে তারাও। এই সমস্যার আগে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায় তাদের শরীরে। যা দেখে আগে থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
২. গরম থেকে পোষা প্রাণীদের ডায়রিয়া হতে পারে। অস্বাভাবিকভাবে মলত্যাগ করলে, মলে রক্তের উপস্থিতি থাকলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
৩. ডিহাইড্রেশনের সমস্যা হলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে প্রাণী। অতিরিক্ত ঘুম হয়। দৌড়ঝাঁপ করতেও সমস্যা হয়। আপনার পোষা প্রাণী হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে বা অধিকাংশ সময় শুয়ে কাটালে ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার।
মহান রব.. নিজ অনুগ্রহে মানুষকে দিয়েছেন তার সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব। এ ধরণী শুধু মানুষের জন্য নয় প্রাণীদেরও রয়েছে অধিকার আর ক্ষুধা! সে তো সকল জীবের সার্বজনীন অনুভূতি! আমরা যেনো তাদের প্রতি নিষ্ঠুর না হই। ভালোবাসার যত্নে পোষা প্রাণী এবং পথের প্রাণীদের এই গরমেও সুস্থ ও আনন্দে থাকে, সেই দিকটা দেখুন আজই!
লেখক: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
ডেল্টা টাইমস্/রেহানা ফেরদৌসী/আইইউ