আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। পরীক্ষার সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ। দীর্ঘদিনের পড়াশোনার পর এখন সময় এসেছে তা যাচাইয়ের। এমন সময়ে প্রয়োজন মনোযোগ ও কিছু কার্যকর কৌশল। এই লেখায় তুলে ধরা হলো শেষ মুহূর্তে মাধ্যমিক শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও বাস্তবভিত্তিক উপায়, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং পরীক্ষার দিন সেরা পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
পরীক্ষাভীতি দূর করার কৌশল:
রিভিশন চার্ট তৈরি করা : জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ—আর তা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা যেমন মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে, তেমনি পরীক্ষার প্রস্তুতি সঠিক সময়ে শেষ করতেও সহায়ক হয়। তবে শেষ মুহূর্তের রিভিশন প্রক্রিয়া তৈরি করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, তা যেন অতিরিক্ত কঠিন না হয়; নইলে তা অনুসরণ করতে গিয়ে উল্টো চাপ তৈরি হতে পারে। পরিকল্পনায় প্রতিটি বিষয়ের জন্য যথাযথ সময় ও গুরুত্ব বরাদ্দ থাকা জরুরি। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং পরীক্ষাভীতি অনেকটাই কমে আসে।
অন্যের সঙ্গে নিজের প্রস্তুতি তুলনা না করা : পরীক্ষার সময় সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করা খুবই সাধারণ ব্যাপার। সহপাঠীদের প্রস্তুতি, অগ্রগতি ও অধ্যয়নের পরিকল্পনা জানার পর উদ্বেগ কাজ করতে পারে। এটি মোকাবিলা করতে চাইলে সহপাঠীদের সঙ্গে নিজের তুলনা করা যাবে না। কারণ প্রত্যেকের শেখার গতি, দক্ষতা এবং সক্ষমতা ভিন্ন। এজন্য সহপাঠীদের অগ্রগতি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের দিকে মনোযোগ দেওয়াই ভালো।
ইতিবাচক মনোভাব রাখা : পরীক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকতে ইতিবাচক মনোভাব থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক চাপকে দূরে রাখতে, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি পারব!’ কথাটিকে মনোবল বাড়ানোর মন্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। নিজের মানসিক ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে হবে। একজন পরীক্ষার্থী যখন মনে করবে যে সে পরীক্ষায় ভালো করবে, কেবল তখনই নিজের সেরাটা দিতে পারা সম্ভব। অযথা মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকতে যা করলে মানসিক স্বস্তি পাওয়া যাবে, সেটিতে মনোনিবেশ করতে হবে।
আমি যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারি : নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কঠিন বিষয়গুলোও নিয়ে অল্প-বিস্তর লেখা সম্ভব। একে ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’ বলা হয়, যা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সহায়তা করে এবং পড়াশোনায় আরও আগ্রহী করে তোলে।
প্রতিটি অধ্যয়ন আমাকে সফলতার দিকে নিয়ে যাবে : শেষ মুহূর্তের প্রতিটি অধ্যয়ন মুহূর্ত একজন পরীক্ষার্থীর মনোবল বৃদ্ধির দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় সাফল্য অর্জিত হয়।
আমি সব সময় মনোযোগী ছিলাম এবং সব পড়া মনে করতে পারব : যে কোনো পরিস্থিতিতে অস্থায়ী বাধা এবং বিভ্রান্তি এড়িয়ে শেষ মুহূর্তে নিজের পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। এই অনুভূতিটি একজন পরীক্ষার্থী নিজেকে বিশ্বাস করালে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
ভুল করার অর্থ শেখার সুযোগ : পড়া ভুলে গেলে ভয় না পেয়ে, ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে তা পুনরায় পড়তে হবে। এটি পরীক্ষার্থীর মানসিক স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করবে এবং কঠিন বিষয়গুলোর প্রতি ভয় কমিয়ে দেবে।
আমি শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিষ্ঠাবান এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ : যে কোনো বিষয়ে সাফল্য অর্জন করতে হলে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম। নিজের পরিশ্রমের ওপর বিশ্বাস রেখে, পড়াশোনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে।
আমি শিখেছি এবং আমিও পারি : পড়াশোনাকে একটি দায় হিসেবে না দেখে, বরং একটি উন্নতির পথ হিসেবে দেখতে হবে। এটি পরীক্ষার্থীর মানসিকতা পরিবর্তন করে তাকে সাহসী করে তুলবে।
আমি আমার সক্ষমতায় আত্মবিশ্বাসী এবং সফলতার জন্য প্রস্তুত : আত্মবিশ্বাস সাফল্যের একটি বড় উপাদান। পরীক্ষার শুরুর শেষ মুহূর্তে নিজের প্রস্তুতির ওপর বিশ্বাস রাখা এবং মানসিক চাপ কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার কঠোর পরিশ্রম ফলস্বরূপ পূর্ণতা পাবে এবং আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করব দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য : নিজের পরিশ্রমে ভালো ফলাফল নিশ্চিত হবে। একটি ভালো ফলাফল, স্বপ্নের চাকরি বা ব্যক্তিগত উন্নতি—ব্যক্তির প্রতিটি প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ একদিন সাফল্য এনে দেবে।
সারা বছর অধ্যয়নের পরও অনেক পরীক্ষার্থী শেষ মুহূর্তে অনেক পড়া ভুলে যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবে এই ভুলে যাওয়া রোধ করতে পরীক্ষার্থীদের কিছু কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। যেমন—
পড়া স্মরণ রাখার কৌশল : অনেক সময় চেষ্টা করেও পড়া মনে রাখা যায় না। বিষয়গুলো স্মরণ রাখতে প্রয়োজন হয় বাড়তি মনোযোগ ও অতিরিক্ত মেধার শ্রম। তবে কিছু সহজ কৌশল অবলম্বন করলে বিষয়গুলো স্মরণ রাখা সম্ভব।
স্পষ্ট করে, জোরে শব্দ করে এবং ধীর গতিতে পড়া : কঠিন বিষয়গুলো পড়ার সময় শব্দ করে উচ্চারণ করে পড়া উচিত। কেননা মনে মনে পড়ার সময় একটি ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখের মাধ্যমে তথ্য পায় মস্তিষ্ক। অপরদিকে শব্দ করে পড়ার মাধ্যমে চোখের সঙ্গে শ্রবণেন্দ্রিয় বা কান দ্বারাও মস্তিষ্ক তথ্য পেয়ে থাকে। এর ফলে তথ্যটি আরও ভালোভাবে মস্তিষ্কে স্থান করে নেয়। তাই যে বিষয়টি নিয়ে পড়া হচ্ছে, তা প্রথমে ভালোভাবে বুঝে বারবার পড়তে হবে।
লিখতে হবে : পড়লে সহজে মনে থাকে, তবে লিখে পড়লে অল্প সময়ে যেকোনো পড়া আয়ত্তে আসে। বিষয়টি আয়ত্তে এলে সম্পূর্ণ অংশ না দেখে পুনরায় লিখতে হবে। লেখার পর নিজেই ত্রুটি খুঁজে বের করতে হবে। ত্রুটি বেশি হলে আবার পড়ে লিখতে হবে।
স্বাচ্ছন্দ্যের সময় খুঁজে বের করতে হবে : প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র সত্তার অধিকারী। কারও মস্তিষ্ক সকালে ভালো কাজ করে, আবার কারও হয়তো গভীর রাতে। কার স্বাচ্ছন্দ্যের সময় কোনটি, তা খুঁজে বের করতে হবে এবং কঠিন বিষয়টি সে সময়ে পড়তে হবে। এতে পড়া সহজে আয়ত্ত করা যাবে। স্বাচ্ছন্দ্যের সময়টি নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন সময়ে পড়তে বসে বুঝে নিতে হবে, কোন সময়ে মস্তিষ্ক সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
নিজেকে অনুপ্রাণিত করা : নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পড়া আয়ত্ত করতে পারলে নিজেকে পুরস্কৃত করতে হবে। যেমন, একটি গান শুনে মনকে শিথিল করা যায়। তেমনি নির্দিষ্ট সময়ে পড়া আয়ত্ত না হলে নিজেকে শাস্তির ব্যবস্থাও করতে হবে। যেমন—পড়াটি শেষ না করে টেবিল থেকে ওঠা যাবে না। নিজেকে অনুপ্রাণিত করার জন্য এসব উদ্যোগ খুবই ফলপ্রসূ।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে : একটি পড়া আয়ত্ত করার পর মস্তিষ্কের সময় প্রয়োজন হয় সেই তথ্যগুলো গুছিয়ে সংরক্ষণ করতে। মূলত বিশ্রাম বা ঘুমের সময় মস্তিষ্ক এই কাজটি করে। তাই মস্তিষ্কের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই পরীক্ষার শেষ মুহূর্তে খাওয়া-ঘুম বাদ দিয়ে পড়তে থাকে—এটি ঠিক নয়। মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ কার্যকারিতার জন্য পরিমিত ঘুম ও বিশ্রাম জরুরি।
আগের পড়া পুনরায় পড়া : পড়া একবার আয়ত্ত করলেই হয় না, সেটি কিছুদিন পরপর পুনরায় পড়তে হয়। আমাদের মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় বা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত তথ্য স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে। অধিকাংশ সময় কঠিন বিষয়টি আমাদের পছন্দের না হওয়ায় আমরা সহজেই তা ভুলে যাই। এই ভুলে যাওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি নির্দিষ্ট সময় পরপর পড়াগুলো পুনরায় পড়া হয়।
একজন শিক্ষার্থীর পড়ার পেছনে শিক্ষকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধিতে দায়িত্ব রয়েছে। শেষ মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধি ও কঠোর অধ্যয়নে উৎসাহিত করার জন্য পরিবারের সদস্যদেরও পাশে থাকতে হবে এবং মানসিকভাবে সহায়তা করতে হবে।
সব শিক্ষার্থীর ফলাফল আশানুরূপ হবে—এমনটি নয়। তবে ফলাফল যাই হোক, অভিভাবকদের দোয়া ও ভালোবাসা সকল শিক্ষার্থীর প্রতি রয়েছে। আজকের পরীক্ষার্থীরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। একটি মাত্র ফলাফল জীবনের সবকিছু নয়।
শুভকামনা রইল স্নেহের সকল পরীক্ষার্থীর প্রতি।
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।
ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই