
হিজড়া শব্দটি কারো কাছে আতংকের নাম আবার কারো কাছে তা হয়ে উঠে প্রহসন।বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এদের অবস্থান বিদ্যমান।আরবি হিজরত বা হিজরি শব্দ থেকে হিজড়া শব্দটি এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা Migrate বা Transfer। শারীরিক ত্রুটির কারণে হিজড়াদের জন্ম। হিজড়ারা সমাজে সাধারণত ক্লীবলিঙ্গ হিসেবে বিবেচিত বা পরিচিত।
তাছাড়া পৃথিবীতে অনেক দেশেই হিজড়াদের পুরুষ বা মহিলা না বলে Third sex বা তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে অভিহিত করে। এছাড়াও হিজরাদের ট্রান্স জেন্ডার, খোজা , হার্মাফ্রোডাইট, শিখণ্ডী, বৃহন্নলা ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়।সমাজে এদের অবস্থান বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম।এসকল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা সমাজের বিভিন্ন স্থানে তাদের সংগঠন গড়ে তোলে এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন কাজ করে বেড়ায়।
বাংলাদেশ হিজড়াদের সংখ্যা প্রায় পনেরো হাজার, মতান্তরে এর একটু বেশি সংখ্যক হিজড়ার বসবাস করে।সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। অন্য একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপমতে, এ সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। ২০১৩ সালের নভেম্বরে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়।রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলেও দেখা যাচ্ছে হিজড়াদের সঠিক কর্মসংস্থানের কোনো নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।তারা তাদের কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়।
হিজড়া বলতেই অধিকাংশ সমাজের চোখে ভেসে ওঠে আটপৌরে শাড়িপরা সস্তা মেকআপ আর কমদামি লিপস্টিকে সেজেগুজে দল বেঁধে চাঁদাবাজি করা। পুরুষালি আচরণে নারীর পোশাক পরিহিত একদল লোক।তাদের চালচলন, কথাবার্তা অন্যান্য নারী বা পুরুষের থেকে ভিন্ন। দেখা যাচ্ছে বাস,ট্রেন,স্টেশন, রাস্তার আনাচে কানাচে তারা বিভিন্নভাবে মানুষদের নিকট টাকা নিয়ে থাকে।যদি কেউ টাকা দিতে অসম্মতি জানায় তবে দেখা যায় তাদের সাথে অশালীন আচরণ করে থাকে।তারা তাদের সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় মানুষদের হয়রানি করে থাকে টাকা নেয়ার জন্য।বিভিন্ন উৎসবমুখর পরিবেশ, ইদ,পুজা পার্বন,বিয়েসহ বিভিন্ন সময়ে হিজড়ারা চাদাবাজি করে থাকে। এছাড়া তাদের টাকা উপার্জন করার অন্যতম মাধ্যম হলো কোনো যুগলের সন্তান জন্মগ্রহণ করা।দেখা যাচ্ছে তারা তাদের সোর্সের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারে কোনো পরিবারে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে তাহলে তারা সে বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয় এবং মোটা অংকের টাকা দাবি করে বসে।
স্বনামধন্য রাজশাহী শহরে এর প্রচলন অন্যান্য বিভাগ থেকে তুলনামূলক বেশি।তারা কোনো না কোনোভাবেই খোঁজ নিয়ে সন্তান জন্মদানকারী পিতামাতার বাসায় বা ফ্ল্যাটে চলে আসে এবং নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করে। যার দরুন দেখা যায়, অনেক পরিবারের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও টাকা দিতে বাধ্য হয়ে থাকে নইলে তারা বাচ্চা শিশুকে নিয়ে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিজড়াদের শক্তি ও ক্ষমতা বহুগুণে বেড়েছে।তবে কেনোই বা তাদের এসকল কাজে লিপ্ত হতে হয়।কেনো তারা এসকল মাধ্যমে টাকা আয় করার উপায় খুজে নিতে হয়?এমনকি তাদের এসকল কর্মকান্ডে প্রশাসন নিশ্চুপ থাকে প্রতিনিয়ত। প্রতিটি মানুষেরই খাদ্যের চাহিদা রয়েছে আর সে খাদ্য যদি পেতে হলে তাকে গুণতে হয় নানা প্রতিকূলতা তখন সে ভিন্ন পথ বেছে নিতে বাধ্যই হয়ে থাকে।হিজড়াদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কর্মস্থানের ব্যবস্থা বা সুযোগ নেই বললেই চলে।দেখা যাচ্ছে যেকোনো কাজেই তারা নিজেকে প্রেজেন্ট করতে গেলে তারা নানা বিড়ম্বনায় পরে।
এছাড়া স্কুল,কলেজ,বা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজড়ারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে গেলেও অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।তবে তারা তো বেচে থাকার অধিকার রাখে তাহলে কেনোই বা তারা এতো অবহেলার শিকার।২০১৪ সালে ২২ জানুয়ারী বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।সরকার এ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, তাদের জন্য সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ, তাদের পারিবারিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সর্বোপরি তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের সম্পৃক্তকরণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে ‘হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন শুরু হয়।
পরবর্তীতে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২১ টি জেলায় তা সম্প্রসারণ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর হতে ৬৪টি জেলায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিবছরই এ কার্যক্রমের আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।২০২১-২২ অর্থবছর হতে এ কর্মসূচির ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তির নগদ সহায়তায় জিটুপি পদ্ধতিতে উপকারভোগীর মোবাইল হিসাবে প্রেরণ করা হচ্ছে। তবে এই সুবিধা সবাই ভোগ করতে পারছে না দেখা যাচ্ছে কিছু সুবিধাভোগী তাদের এই অধিকারগুলো ভোগ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।হিজড়াদের মূলধারার সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে এখন পর্যন্ত যেই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার কৌশলগুলো ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো সরকার বা দাতা সংস্থাগুলো এই প্রকল্পগুলোতে উপকারভোগী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে না।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের প্রতি নজর কঠোর করা,তাদের মৌলিক অধিকার পুরণে সর্বাত্তোক চেষ্টা করা।যদি তারা সরকার কর্তৃক সকল সুবিধা সঠিকভাবে পেয়ে থাকে তবে সাধারণ মানুষের নিকট তারা এতোটা হেয় প্রতিপন্নের শিকার হবে না এবং সাধারণ মানুষও তাদের দ্বারা হয়রানির দারস্থ হবে না।
ডেল্টা টাইমস/সিআর