বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলাঘর

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

/ ফিচার

জহরুল ইসলাম (জীবন)  হরিপুর /ঠাকুরগাঁও:

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলাঘর। ঠাকুরগাঁও জেলায় এক সময় গ্রামে গ্রামে ছিল ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলাঘর। ধানের মৌসুমে কৃষকরা বুক ভরা আশা নিয়ে সোনার ফসল তুলতো এই গোলাঘরে। প্রয়োজনের সময় গোলাঘর থেকে ধান বের করে রোদে শুকিয়ে ভাঙ্গানো হতো। সারা বছর ধান ও চাল সংরক্ষণ করতে গোলাঘর খুবই উপযোগী। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের এই ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হারিয়ে যেতে বসেছে।

মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেত থাকলেও অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে নেই ধান মজুদ করে রাখার বাঁশ-বেত ও কাদা দিয়ে তৈরি গোলাঘর। যুগের হাওয়া পাল্টেছে পাল্টেছে সারা বছরের জন্যে ধান সংরক্ষণের ধরণও। দু‘চার জন বড় গৃহস্থ ছাড়া ছোট খাটো কৃষকেরা এখন আর ধান মজুদ করে রাখেন না। গ্রাম বাংলার প্রবাদ বাক্যটি গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ” এ যেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে কালজয়ী কোনো উপন্যাস।

এক সময় যা বাস্তবে ছিল, আজ তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই জেলার প্রায় প্রত্যেক পরিবারে বাঁশ দিয়ে চটা তৈরি করে সেটাকে গোলাকার আকৃতির ধানের গোলাঘর তৈরী করে বাড়ির উঠানে উচুঁ ভীত বানিয়ে সেখানে বসানো হতো। আর সেটার ছাউনি হিসেবে খড়, গোলপাতা এবং টিন ব্যবহার করা হতো। ছাউনির উপরের দিকে বেশ উচুঁ টিনের পিরামিড আকৃতির হতো যা অনেক দূর থেকে দেখা যেত।

ইদুঁর জাতীয় প্রাণী এবং বর্ষার পানি থেকে রক্ষা করে ফসল সংরক্ষনের জন্য গোলাঘর ছিল ব্যাপক জনপ্রিয় এবং কার্যকর। একটি বড় গোলাঘরে ৪০ থেকে ৫০ মণ আর একটি ছোট গোলাঘরে ২০ থেকে ৩০মণ ধান সংরক্ষণ করা যেতো। আর যে সকল পরিবারের গোলাঘর তৈরি করার সামর্থ থাকত না তাদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে থাকত গোলার মতো ছোট আকৃতির আউড়(কুঠি) । আউড় (কুঠি) বসানো হতো ঘরের মধ্যে।

কম খরচে বেশি পরিমাণে শস্য সংরক্ষণের গোলার বিকল্প কিছুই নেই। কালের আর্বতনে গ্রামাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য গোলাঘর ও আউড় (কুঠি) এখন খুবই কম দেখা মেলে। বর্তমান সময়ে গ্রামাঞ্চলে যেটুকু শস্য উৎপাদিত হয় সেগুলো বিক্রি করে চাউল কিনে খাওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার মানুষের চাল-চিত্র উলট-পালট করে দিয়েছে বলে সর্ব মহলের ধারণা।

এছাড়াও ঠাকুরগাঁও শহরে আধুনিকতার ছোয়া লেগেছে। তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বড় বড় বিল্ডিং কল-কারখানা। ভরাট করে ফেলছে ধানী জমিসহ জলাশয়। ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই ধানের গোলাঘরের ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে ধান চাষেও আগ্রহী নন কৃষকেরা,যার ফলে ধানের গোলার এখন আর আগের মতো কদর নাই। সাম্প্রতিক কালে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙ্গল যেন উল্টে-পাল্টে দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলের চালচিত্র। আর একের পর এক ফসলি জমি মৎস্য চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় কৃষি জমির সংখ্যা কমে গেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

আগেকার সময় ছেলে-মেয়ে বিয়ের জন্য পাত্র বা পাত্রী পক্ষের সম্পদের মাপকাঠি ধরা হতো বাড়িতে গোলাঘর বা আউড়ের (কুঠি) পরিমাণের উপর নির্ভর করতো। বর্তমানে কন্যা পাত্রস্থ করতে পিতা ভাবে ছেলের সরকারি চাকুরি কিংবা বড় ধরণের কোন ব্যবসা আছে কিনা? এদিকে, গোলাঘর নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল, গোলাঘরের চাহিদা কমে যাওয়ায় গোলাঘর তৈরির অনেক কারিগর তাদের পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। ফলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলাঘর আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এখন আর দেশের বিভিন্ন জেলায় শহর থেকে আসা গোলাঘর নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মিলে না। জামালপুর ইউনিয়নের বিশ্বাসপুর এলাকার মোঃ কুদ্দুস আলী  জানান, এখন গোলাঘর প্রচলন প্রায় উঠে গেছে বললেও ভূল হবে না। আমার বাড়িতে একটি গোলাঘর আছে কিন্তু দীর্ঘ দিন সেটাকে ব্যবহার করা হয় না। কয়েক বছর পূর্বেও এলাকায় প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে কম বেশি গোলাঘর থাকতো। সব কিছু মিলিয়ে গ্রাম বাংলার কৃষকের এক সময়ের সমৃদ্ধির প্রতীক ছিলো এ গোলাঘর যেটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।