পানি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পানি ছাড়া এক মুহুর্ত চলা অসম্ভব।পানির আরেক নাম জীবন৷ অথচ এই পানি, বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি ক্রমশ কমে যাচ্ছে৷ যা জীবনের জন্য এক হুমকি৷ এই হুমকি মোকাবিলায় সচেতন হতে হবে আপনা। আমাদের ভাবতে হবে যে পানির উৎস অসীম নয়। কাজেই পানি ব্যবহারের সাথে সাথে এর অপচয় রোধ করা অতীব জরুরী। প্রতিটি মানুষের উচিত পানির অপচয় কমানো এবং এর বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা।পানির অস্তিত্বের উপর টিকে আছে সমগ্র প্রাণী এবং উদ্ভিদকুল। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পানির ব্যবহার অপরিহার্য। যার অধিকাংশ অপচয় হয়ে যাচ্ছে। একটু সচেতন হলে পানির এই অপচয় রোধ করা সম্ভব।
তাছাড়া মানবদেহে প্রায় ৭০ ভাগই হচ্ছে পানি। অর্থাৎ মানবদেহের দুই তৃতীয়াংশই হচ্ছে পানি। এর মধ্যে আমাদের রক্তে ৮৩%, হাড়ে ২২%, মস্তিস্কে ৭৪% এবং পেশিতে ৭৫% পানি রয়েছে। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য আমাদের জীবনে পানির গুরুত্ব অপরিসীম।
দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ গুলোর সঠিক কর্ম সম্পাদনের জন্য পানি প্রয়োজন। যদি যথেষ্ট পরিমানে পানি পান না করা হয় তাহলে শরীর খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পরে। যেমন- গাছের গোড়ায় পানি না দিলে গাছ যেভাবে শুকিয়ে যায়, তেমনি পানির অভাবে মানবদেহের পুষ্টি সরবরাহ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে ব্যাঘাত ঘটে। শরীরের প্রত্যেকটি কাজে পানির প্রয়োজন। শরীরকে সচল ও শারীরিক সক্ষমতার জন্য খাদ্য তালিকায় প্রচুর পানি থাকতে হবে। দেহে পানির অভাব দেখা দিলে নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি হয় যেমন- পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, কিডনির সমস্যা, শরীরে টক্সিন জমা ইত্যাদি।
কবিতা রাণী মৃধা।
পানি রক্তে ও কোষে অক্সিজেন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এছাড়াও পুরো দেহে রক্ত সরবরাহ ও সঞ্চালন বৃদ্ধি করে পানি। পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করে। আমাদের দেহে সঠিক ভাবে খাবার জহম করার জন্য প্রচুর পানির দরকার। তাই খাদ্যের পাশাপাশি প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে। পানি কিডনিতে পাথর হওয়া থেকে বাঁচায়, কারন পানি থাকে ইউরিনের লবন ও খনিজ জা কিডনিতে পাথর হওয়া থেকে আটকায়। আমাদের ব্রেইনের ৭৪% হচ্ছে পানি। তাই একটু পর পর পানি পান করলে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকা যায় এবং শারীরিক শক্তি বাড়ে।
এছাড়া বিশ্বে যখন ত্বকের যত্নে নামী দামী প্রসাধন সামগ্রীর ব্যাবহার বাড়ছে তখন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা ত্বকের সৌন্দর্য বজায় রাখতে পানি সম্পর্কে একটি অভিন্ন তথ্য জানিয়েছে। তারা গবেষনা করে দেখেছে যে ত্বকে পানির পরিমান স্বাভাবিক থাকলে ত্বক ভালো থাকে, ত্বকে ভাজ, র্যাশ সহ সব ধরনের ইনফেকশন কমাতে সাহায্য করে। আমাদের শরীর থেকে প্রতিদিন কোন না কোন ভাবে পানি বের হয়ে যায়, যেমন আমাদের ফুস্ফুস থেকে নিঃশ্বাসের সাথে দৈনিক দুই থেকে চার কাপ পানি বের হয়ে যায়।
প্রতিদিন পানি পান করতে হবে তা দেহের ওজন ও কাজের পরিমানের উপর নির্ভর করে। পুশটিবিদ গন বলেন, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ গ্লাস অর্থাৎ ২ লিটার পানি করা উচিৎ। তাহলে শরীর সুস্থ থাকবে এবং শরীরের আদ্রতা বজায় থাকবে। এছাড়া যারা বেশি পরিশ্রম করে এবং অতিরিক্ত ঘামে তাদের পানির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। আবার যাদের ওজন বেশি তাদের জন্যো পানির প্রয়োজন বেশি। সে জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি হলো শরীরের ওজন কে ৩০ দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায় ততটুকু পানি পান করলেই সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব।
এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ‘ দ্যা ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন মেডিকেল ডিরেক্টর অ্যামেসিয়েশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। সকলের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ করে তারা এ উপদেশ দিচ্ছে যে তৃষ্ণা পায় ততটুকু পানি পান করা উচিৎ, তারচেয়ে বেশি নয়। কারন বেশি হলেই পানির অপর নাম জীবন নয় তা মরণ ও হতে পারে।
এসকল উপকারীতা থাকা সত্ত্বেও বা প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও পানির অপচয় হয়েই চলছে। পানির অপচয় রোধ করা অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যেভাবে পানির অপচয় রোধ করতে পারি -
• আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য বা পানীয় তালিকার কিছু পণ্য তৈরিতে অনেক পানি প্রয়োজন হয়। যেমন এক কাপ কফি বাগান থেকে আপনার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ হচ্ছে ১৪০ লিটার পানি। আর এক লিটার দুধের পেছনে ব্যয় হচ্ছে ১,০০০ লিটার পানি। তাই এ সব পানীয়র অপচয় কমানোর মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব।
• এক কেজি মাংস উৎপাদনে সবমিলিয়ে খরচ হয় ১৫ হাজার লিটারের মতো পানি। এই হিসাবের মধ্যে পশুর জন্ম এবং বেড়ে ওঠার সময় প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণও বিবেচনা করা হয়েছে। এবার ভেবে দেখুন, এক বেলা মাংস না খেয়ে কতটা পানি বাঁচানো সম্ভব?
• মুখ ধোয়া বা দাঁত ব্রাশ করার সময় পানির ট্যাপ বন্ধ রাখুন। একান্ত যদি গরম পানি পেতে ট্যাপ একটু খুলে রাখতে চান, তাহলে সেই পানি ব্যবহার করতে পারেন ব্রাশ ধোয়ার কাজে।
• কাপড় ধোয়া বা থালাবাসন পরিষ্কারের মেশিন এখন ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। পুরোপুরি ভর্তি না হওয়া অবধি এ সব মেশিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
• অনেকেই যখন-তখন টয়লেট ফ্লাশ করে থাকেন। এতে প্রচুর পানি অপচয় হয়। তাই একান্ত প্রয়োজন না হলে ফ্লাশ করা থেকে বিরত থাকুন।
• বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ সুযোগ পেলেই পুকুর বা খালে ময়লা ফেলে। এতে করে পানি দূষিত হয়। আর দূষিত পানি পুনরায় পান উপযোগী করে তুলতে খরচ হয় প্রচুর অর্থ এবং বিদ্যুৎ। তাই পুকুরে বা খালে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে বা মাটিতে গর্ত করে ময়লা ফেলুন।
• অনেক সময় পানির পাইপে থাকা বিভিন্ন জোড়া হালকা হয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি বাইরে পড়ে যায়। একটু সতর্ক হলেই এভাবে পানির অপচয় রোধ করা যায়। এছাড়া ছাদের ট্যাংকি ভর্তি হয়ে যাতে পানি বাইরে পরে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখুন। সময়মতো পানির পাম্প বন্ধ করে দিন।
• বাথরুমে থাকা গতানুগতিক বা পুরনো পানির ঝরনাগুলো সরিয়ে ফেলুন। বর্তমানে বাজারে পানি সাশ্রয়কারী ঝরনা পাওয়া যায়। সেগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পানির অপচয় রোধ সম্ভব।
• পানি পান করার পর যদি গ্লাসের তলায় খানিকটা পানি থেকে যায়, তাহলে তা ফেলে দেবেন না। সেটুকু আপনার গাছের গোড়ায় ঢালতে পারেন কিংবা চায়ের কেটলিতে জমাতে পারেন।
• বৃষ্টির পানি জমা করে তা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার এমনকি পান করাও সম্ভব। বর্তমানে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের বিভিন্ন সরঞ্জামও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
পানির অপর নাম জীবন-এটি অনেক পুরনো কথা হলেও পানির প্রয়োজনীয়তা সত্যিই মানুষের জীবনে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে। এখন তো তবু পানি পাওয়া যায়, অল্প কিছুদিন পর হয়তো এই পানিটুকুও পাওয়া যাবে না। অথচ, আপনার সামান্য উদ্যোগ পানির অপচয় রোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই চেষ্টা করে দেখুন না!