গুমের শিকার পরিবারগুলোকে এখনো মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে

জাতীয়

বিগত শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের অসহায় পরিবারগুলোকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন

2026-10-18T14:15:47+06:00
2026-10-18T14:15:47+06:00
রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিব
গুমের শিকার পরিবারগুলোকে এখনো মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১৫ পিএম   (ভিজিট : ৩)

বিগত শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের অসহায় পরিবারগুলোকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি বলেন, অপকর্মের দাগ মুছতে এবং নিজেদের বাঁচাতে তৎকালীন সরকারি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র গুম হওয়া পরিবারগুলোর ওপরই পাল্টা মামলা দিচ্ছে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে র‍্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ ও সাবেক এডিশনাল ডিজি আনোয়ার লতিফ কর্তৃক গুমের স্থান পরিদর্শন করেন হাবিবুর রহমান। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বাংলাদেশ গুম পরিবার কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেনসহ গুম পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ওপর যদি এখনো কোনো প্রশাসনিক নির্যাতন বা অন্যায্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে নিজের যত বড় ক্ষতিই হোক না কেন, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন।

হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, গুমের ঘটনাগুলোকে ভিন্ন খাতে নিতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে বিগত সরকার ও তাদের সহযোগীরা নানা ধরনের মিথ্যা গল্প সাজিয়েছিল। ‘গুম হওয়া ব্যক্তিরা রাগ বা অভিমান করে ঘর ছেড়ে চলে গেছে’ কিংবা ‘গুমের ঘটনাগুলো সাজানো’—এমন কাল্পনিক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ গুম পরিবার কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেনের উদাহরণ তুলে ধরে হাবিব বলেন, বেল্লালকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল যে তিনি ব্যবসায়িক সংকটের কারণে নিজেই আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। অথচ বেল্লালের নিজের ভাই সশরীরে উপস্থিত থেকে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, র‍্যাবই তাকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়েছিল। অপপ্রচারের এই ধারা বন্ধ না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের এই উপদেষ্টা।

বর্তমান সরকারের ভালো উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ভেতরে থাকা কতিপয় কর্মকর্তা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রশাসনের ভেতরে এখনও অতীতের ‘ভূত’ রয়ে গেছে। এই স্বার্থান্বেষী ও অনৈতিক কর্মকর্তারা সুবিধার বিনিময়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ‘গায়েবি মামলা’ সাজিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করছে।

নিজের এলাকা পাবনা ও ঈশ্বরদীর বর্তমান চিত্র তুলে ধরে হাবিব বলেন, ঈশ্বরদী আজ মাদকে ছেয়ে গেছে; খুনি, সন্ত্রাসী ও দলছুট মাস্তানরা সেখানে সক্রিয় রয়েছে। অন্যায্য ঘটনা ও অপরাধ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে তা নেওয়া হয় না, উল্টো অসাধু প্রভাবশালীদের মিথ্যা কাউন্টার মামলা গ্রহণ করছে পুলিশ। স্থানীয় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে নালিশ জানিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

প্রশাসনের সাজানো মামলা ও অনৈতিক আচরণের করুণ স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি চ্যানেল ২৪-এর টকশো শেষ করে বের হওয়ার পর আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আমার বিরুদ্ধে গাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের মতো একাধিক সাজানো ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ওই মিথ্যা মামলায় তৎকালীন বিচার ব্যবস্থায় আমাকেসহ ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকে চার বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, অতীতে যেভাবে সুবিধার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের দমন করতে ভুয়া মামলা দেওয়া হতো, আজও প্রশাসনের কতিপয় লোক সেই একই অপচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘ ১০, ১২ বা ১৫ বছরের যন্ত্রণাময় জীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরে হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, এই পরিবারগুলোর অবর্ণনীয় কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গুম হওয়ার সময় ছোট থাকা শিশুরা আজ বড় হয়ে উঠেছে, কিন্তু তারা আজও জানে না তাদের বাবা জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন।

হাবিবুর রহমান হাবিব যোগ করেন, কোনো মানুষ মারা গেলে স্বজনরা অন্তত তার কুলখানি বা মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করতে পারে এবং পরম করুণাময়ের কাছে দোয়া করতে পারে। কিন্তু গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্ত্রীরা আজও জানেন না তারা কি স্বামীর ফেরার আশায় নতুন কাপড় পরবেন, নাকি শোকের প্রতীক সাদা কাপড় পরবেন। সন্তানরা স্কুলে গেলে যখন সহপাঠীরা বাবার কথা জানতে চায়, তখন উত্তর দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না তারা।

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দেশের বিবেক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের মাধ্যমে এই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিকরা যদি রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সরেজমিনে এসে প্রকৃত সত্য ঘটনাগুলো জাতির সামনে ও বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন, তবেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ নেবে । এতে  বছরের পর বছর ধরে কান্নাকাটি করা গুম হওয়া পরিবারগুলো কিছুটা হলেও আইনি সুরক্ষা ও মানসিক শান্তি পাবে।

অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেন জানান, ২০১৬ সালে অনলাইনে বাসের টিকিট কেটে যাওয়ার পথে এসবি কাউন্টারের সামনে থেকে রাজসাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের উপস্থিতিতে ১২-১৪ জন লোক তাকে একটি মিনিবাসে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর তার পরিবার মিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে, যা পরবর্তী সময়ে তদন্ত করে সরাসরি মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ। সে সময় জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পুলিশ প্রশাসন, সিআইডি ও আইজিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেল্লাল হোসেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, বাসের অনলাইন টিকিট, জিডি কপি, তদন্ত প্রতিবেদন ও পত্রিকার সংবাদগুলো মিথ্যা প্রমাণ করার ক্ষমতা কারও নেই। অথচ বিগত সরকারের আমলে গুম সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিডিআর রিপোর্টসহ বিভিন্ন নথি গায়েব করে ফেলা হয়েছিল। রাজসাক্ষী ও অকাট্য নথিপত্র থাকার পরও আজ ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন।

ঘুষ বাণিজ্য ও বিভিন্ন জেলায় সাজানো ‘গায়েবি মামলা’র অভিযোগ তুলে বেল্লাল বলেন, বর্তমানে জুলাই গণহত্যা ও গুমের মামলায় অভিযুক্ত ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধেই নতুন করে ‘গায়েবি মামলা’ দিচ্ছে।

ইতোমধ্যেই নড়াইল, ঝালকাঠি, খাগড়াছড়ি, সিলেট ও হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গুমের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বিস্ফোরক মামলা ও অন্যান্য গায়েবি মামলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে যদি গুমের শিকার পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক গায়েবি মামলা অব্যাহত থাকে, তবে দেশ থেকে ‘আয়নাঘর’ ও গুমের অপসংস্কৃতি কখনোই বিলুপ্ত হবে না।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ