প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩০ পিএম (ভিজিট : ০)

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫১ শতাংশ উল্লেখ করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, কোনো সভ্য সমাজে বাল্যবিবাহের এমন চিত্র অকল্পনীয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী সমিতি (সিএসডব্লিউএবি) আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাল্যবিবাহ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও কারও অবস্থানের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ জোর গলায় বলছেন, তারা বাল্যবিবাহ করবেনই, তাদের কে বাধা দেবে। অথচ অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মা ও অনাগত সন্তানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির গভীর আশঙ্কা থাকে। এখানে বিয়ে না করার কথা বলা হচ্ছে না; বরং কিছুটা অপেক্ষা করে উপযুক্ত বয়সে বিয়ে করার কথা বলা হচ্ছে। যেন ছেলে, মেয়ে ও ভবিষ্যৎ সন্তান—সবার জন্যই ভালো ফল আনতে পারে। পাশাপাশি পুষ্টির বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহের মতো অন্যায়ের পক্ষে এক ধরনের জেদ বা অবুঝ মানসিকতা কাজ করে এবং এই মানসিকতা থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে শুধু আইন দিয়ে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজকর্মীদের ভূমিকা যেমন দরকার, তেমনি মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে মনোসামাজিক বা সাইকোসোশ্যাল উদ্যোগও প্রয়োজন।
মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যার সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের প্রভাবের পার্থক্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, কিছু শিশু জন্মগতভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মায়। স্নায়ুবিক বিকাশের সমস্যা কিংবা যোগাযোগজনিত ব্যাধির মতো বিষয়গুলোর আলাদা চিকিৎসা ও সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে মানুষের পরিবেশ কীভাবে তাকে কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, সেটিও গভীরভাবে বুঝতে হবে; কারণ পরিবেশ মানুষকে কোনো কিছুর দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, আবার কোনো কিছু থেকে দূরেও রাখতে পারে। এ ধরনের প্রভাব মোকাবিলায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি মনোসামাজিক পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সমস্যা সমাধানে এককভাবে কাজ করার নীতি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়, এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিছিল করা, স্লোগান দেওয়া কিংবা নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং শুধু এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে কি না, সেই মৌলিক প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় শিশুদের নিয়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে অনেক সামাজিক সমস্যার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসবে। শিশুটি ঘটনার আগে কোথায় গিয়েছিল, তার পারিবারিক পরিস্থিতি কী ছিল এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটল—এসব প্রশ্নের আসল উত্তর খুঁজতে হবে। একই সময়ের ব্যবধানে কুমিল্লায় একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে ঘিরে দুটি পৃথক ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সমাজের মানুষের মনমানসিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করে।
মন্ত্রী বলেন, এসব সমস্যা শুধু আইন-আদালত কিংবা চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না। কোনো একটি ঘটনা ঘটার পর শিশুকে উদ্ধার করা, নিরাপদ স্থানে নেওয়া, চিকিৎসা দেওয়া কিংবা সাময়িক সহায়তা করা জরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি ঘটনাটির পেছনের কারণ, সংশ্লিষ্ট পরিবারের অবস্থা এবং ঘটনার পরবর্তী প্রভাবও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে; অন্যথায় সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, আপনি কত জেলখানা বানাবেন? কত হাসপাতাল বানাবেন? কত পুলিশ, ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দেবেন? এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে করবেন, যদি ঘটনার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে না পারেন?
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও ভূখণ্ডের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে সামাজিক সমস্যার সমাধানে বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু একটি বা দুটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনে সাময়িকভাবে ব্যবস্থা নিলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি কী, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো কী অবস্থায় আছে এবং তাদের জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, এসব বিষয়েও নজর দিতে হবে।
নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ বছরে তার কাজের পরিধিতে চিকিৎসা ও রাজনীতি- দুটি ক্ষেত্রই যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তার। এসব অভিজ্ঞতা থেকে তার মনে হয়েছে, সমাজের সব খাতের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের সমস্যার সমাধানে খুব বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। তবে নিজের এই উপলব্ধি ভুলও হতে পারে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।
সমাজকর্মীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো উদ্যোগকে শুধু সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে কমিউনিটি পর্যায়ে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি এলাকায় শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দিতে এবং তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ওই এলাকার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। কমিউনিটির অংশগ্রহণ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, জেলা পর্যায়ে উপপরিচালক এবং এর ওপর পরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মহাপরিচালকের মতো পদ রয়েছে। কিন্তু সামাজিক সমস্যার গভীরতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় সমাজকর্ম এবং সমাজকল্যাণের বিষয়গুলোকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, একসময় সমাজকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূত ছিল, পরে এটি পরিদপ্তরে রূপ নেয়। সামাজিক সমস্যার ধরন ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় সমাজকর্মের প্রয়োজনীয়তা এবং এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাল্যবিবাহ, শিশু নির্যাতন ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। আইন প্রয়োগ, চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা, দক্ষ সমাজকর্মী এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ, সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলেই এসব সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই