প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৫ এএম (ভিজিট : ০)

বৃষ্টি ও গরমের আবহাওয়া অব্যাহত থাকায় দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, অসম্পূর্ণ টিকাদানের কারণে দেশে হামের সংক্রমণে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ দেখা যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, বৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৭৮২ জন। এ সময় মারা গেছেন আটজন।
চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৬৯ হাজার ১৪৯ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ হাজার ৩০৩ জন, যা এ বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১২ জনের।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “এখন ডেঙ্গু বাড়তেই থাকবে। বৃষ্টি হচ্ছে, গরমও পড়ছে। এ পরিস্থিতি যতদিন থাকবে, ডেঙ্গুর সংক্রমণও ততদিন বাড়বে। এমনকি বৃষ্টি শেষ হওয়ার পরও প্রায় এক মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৬৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। অন্যদিকে মৃতদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ২০৯ জনের।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৩৪৫ জন, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় ৩৭১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮৮ জন, বরিশালে ১৬৪ জন, খুলনায় ২৭৬ জন, রাজশাহীতে ১৩০ জন, সিলেটে ১৭ জন, রংপুরে ৭৩ জন এবং ময়মনসিংহে ১০৮ জন রয়েছেন।
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “এডিস মশার বিস্তার অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়ছে। মশার বিস্তার যত বাড়বে, ডেঙ্গুর সংক্রমণও তত বাড়বে। এ কারণে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে এবং আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহারও বেশি হতে পারে।”
তিনি বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তার রোধ করা। ২০১৯ সালের মহামারির পর ডেঙ্গু ঢাকা ছাড়িয়ে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।”
হামের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’
দেশে বর্তমানে হামের মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ডা. মুশতাক হোসেন। তার মতে, অসম্পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচির কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক এলাকায় শিশুদের টিকা দেওয়া হয়নি। ফলে সংক্রমণ এমনভাবে ছড়াচ্ছে যে বয়স্ক মানুষ এবং ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক মা-ও প্রয়োজনীয় টিকা পাননি। এ কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে।”
তার ভাষ্য, “কোনো জনপদ বাদ দেওয়া যাবে না। অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কভারেজ ৮০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যারা টিকা নিতে আসেনি, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগও যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৮৩ শিশু।
গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে হামের তথ্য প্রকাশ করছে। এ সময় থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ১০১ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮৩ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫৩ জন সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪৪ শিশু।
এ ছাড়া ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৯৫১ জনের।