
অভিনয়কে ভালোবেসেই শোবিজে পথচলা শুরু করেছিলেন অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া। একটা সময় তার কাছে ক্যারিয়ার মানেই ছিল অভিনয়, নিয়মিত কাজ করাকেই মনে হতো সফলতার মাপকাঠি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার ভাবনা। এখন অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবার, নিজের ঘর ও ব্যক্তিগত জীবনকেও গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে পছন্দ নয়-এমন কোনো কাজে শুধু পারিশ্রমিকের জন্য দীর্ঘ সময় দিতে চান না এই অভিনেত্রী।
বুধবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিজের অভিনয়জীবন, ব্যক্তিগত জীবন, প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরি এবং কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান ও সীমারেখা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন শবনম ফারিয়া।
অভিনয় নিয়ে নিজের আগের ভাবনার কথা জানিয়ে ফারিয়া লেখেন, ‘অনেকদিন পর্যন্ত আমার মনে হতো, আমার জীবনটা বোধহয় অভিনয়কে ঘিরেই হতে হবে। অভিনয় ভালোবেসেই শুরু করেছিলাম। একটা সময় মনে হতো, ক্যারিয়ার মানেই অভিনয়, আর নিয়মিত কাজ করাটাই হয়তো সফলতার মাপকাঠি।’
তবে জীবনের নানা সংগ্রামের পর এখন নিজের কাঙ্ক্ষিত জীবন পেয়েছেন বলে জানান তিনি। ফারিয়ার ভাষায়, ‘অনেক বছর অনেক ধরনের সংগ্রামের পর আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমার সেই জীবনটা আছে, যেটা আমি সবসময় চেয়েছি-একটা পরিবার, একটা নিজের ঘর, এমন একটা জায়গা, যেখানে দিন শেষে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।’
এই জীবন পাওয়ার পরই কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করেছেন বলে জানান অভিনেত্রী। তবে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এখনও আগের মতোই আছে তার।
শবনম ফারিয়া বলেন, ‘আমি এখনো অভিনয় ভালোবাসি। এখনও অভিনয় করতে চাই। কিন্তু এমন কোনো স্ক্রিপ্টে শুধু টাকার জন্য ১২-১৫ ঘণ্টা সময় দিতে চাই না, যেটা আমি নিজেই পছন্দ করি না। তার সঙ্গে শুটিংয়ে যাওয়া-আসার ট্রাফিক জ্যাম তো আছেই! আমি বরং এমন একটা গল্প বা চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করতে চাই, যেটা সত্যিই আমাকে এক্সাইট করবে।’
এই ভাবনা থেকেই প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরিকে নিজের কাজের একটি অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। ফারিয়া জানান, শুরুতে রাকিন তাকে এই কাজের ধারণা দেন। এরপর বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। কেউ সরাসরি, কেউ এজেন্সির মাধ্যমে, আবার কেউ পরিচিত বা বন্ধুদের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। গত এক বছরে বেশ কিছু ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
তবে সব ব্র্যান্ডের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি শবনম ফারিয়া। নিজের ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্র্যান্ডগুলোই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি।
প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরির অন্যতম কারণ ভালো পারিশ্রমিক-এ কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় দিয়ে নিজের সুবিধামতো সময়ে কাজ করে ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পরিবার, সংসার ও নিজের জন্যও সময় রাখা সম্ভব হয়। তাই এ ধরনের কাজ করতে তার আপত্তি নেই।
তবে শুধু অর্থের জন্য নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে যায় না-এমন কোনো কাজ করতে চান না ফারিয়া। তার মতে, কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে তার মুখ, নাম ও বিশ্বাস যুক্ত হচ্ছে। তাই সেই পণ্য বা সেবার সঙ্গে তিনি নিজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কি না, সেটিও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কাজের কিছু সীমারেখার কথাও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, কোনো স্কিন হোয়াইটেনিং পণ্য, অ্যাসথেটিক সেবা বা প্রক্রিয়া কিংবা স্লিমিং টি, কফি, পানীয় বা ওষুধ প্রচার করেন না। এগুলো নিয়ে তার সিদ্ধান্ত একান্তই ব্যক্তিগত।
নিজের ত্বকের রং ও শারীরিক গঠন নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন শবনম ফারিয়া। তিনি মনে করেন, তার গায়ের রং, নাক, মুখের গঠন, চিবুক ও শরীর-সবই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। তাই সুন্দর হতে হলে আরও ফর্সা, আরও চিকন কিংবা শরীরের কোনো অংশ পরিবর্তন করতে হবে-এমন ধারণা প্রচার করতে চান না তিনি।
স্লিমিং পণ্যের প্রচার না করার কারণ জানিয়ে ফারিয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরে নিজেই ওজন নিয়ে সংগ্রাম করছেন। তাই ওজন কমানোর পথ কতটা কঠিন, সেটি তিনি জানেন। তবে কোনো স্লিমিং টি, কফি কিংবা ম্যাজিক্যাল ড্রিংকের ওপর কখনোই বিশ্বাস করেননি।
নিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি হরমোনজনিত বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, শর্টকাটের বদলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, ডায়েটিশিয়ানের নির্দেশনা, শরীরচর্চা ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের ওপর বিশ্বাস করেন। সময় একটু বেশি লাগলেও এমন কোনো শর্টকাটের কথা অন্য কাউকে বলতে চান না, যেটিতে নিজেই বিশ্বাস করেন না।
নিজে যে পণ্য বা সেবা ব্যবহারে বিশ্বাস করেন না, শুধু অর্থের বিনিময়ে সেটি অন্যদের প্রচার করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না বলে জানান শবনম ফারিয়া। তার ভাষায়, নিজে কোনো কিছু ব্যবহার করতে বিশ্বাস না করলে শুধু টাকার জন্য অন্য কাউকে সেটি করার পরামর্শ দেওয়াও তার কাছে ঠিক মনে হয় না।
দেশে ফর্সা হওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অভিনেত্রী। তার মতে, এখন শুধু ফর্সা হলেই হচ্ছে না, নাক কেমন হবে, চিবুক কেমন হবে, শরীরের গড়ন কেমন হবে কিংবা কতটা চিকন হতে হবে- সৌন্দর্যের যেন একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
তবে নিজের যত্ন নেওয়া কিংবা নিজের কোনো কিছু পরিবর্তন করতে চাওয়াকে ভুল মনে করেন না ফারিয়া। এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলেই মনে করেন তিনি। কিন্তু একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত এমন অনুভব করানো যে সৃষ্টিকর্তা যেভাবে তাকে সৃষ্টি করেছেন, সেটি যথেষ্ট সুন্দর নয়- এ জায়গাতেই তার আপত্তি।
সবশেষে নিজের কাজের সীমারেখা প্রসঙ্গে শবনম ফারিয়া বলেন, তিনি যেসব পণ্য প্রচার করেন, সেগুলোর প্রতিটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত পণ্য হতে হবে- এমনটা বলছেন না। তবে তার কিছু নিজস্ব সীমারেখা রয়েছে। বর্তমানে সেই সীমারেখা মেনে কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে এবং সচেতনভাবেই সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে চান তিনি।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই