প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৫ পিএম (ভিজিট : ০)

সংগৃহীত ছবি
ইরানের নতুন জাহাজ বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কাসেম বসিরের যুদ্ধকালীন আত্মপ্রকাশ পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে। এই নতুন প্রযুক্তির ফলে মার্কিন নৌ আধিপত্য অত্যন্ত সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সামুদ্রিক সংঘাতে হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে এই ইলেক্ট্রো-অপটিক্যালি নির্দেশিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরানি বাহিনী। এর জবাবে মার্কিন বাহিনীও প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি ইরানি ক্রুড তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে।
সলিড-ফুয়েল চালিত কাসেম বসির ক্ষেপণাস্ত্রটির পরিসীমা ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার এবং এটি ৫০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। টার্মিনাল অপটিক্যাল সেন্সরগুলোর সাহায্যে এটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন এবং এর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ডেস্ট্রয়ারগুলোর বিরুদ্ধে প্রথমবার সফলভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরান এই আক্রমণকে তাদের আঞ্চলিক নৌচাপ মোকাবিলা এবং মার্কিন সমুদ্র নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ‘সক্রিয় প্রতিরোধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে যে সমস্ত আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে এবং কোনো মার্কিন প্রাণহানি ঘটেনি। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপ এবং জাস্কের উপকূলে ইসলামিক রেভল্যুশনি গার্ড কোর ( আইআরজিসি)'র সাথে যুক্ত বাণিজ্যিক ট্যাংকারগুলোকে অচল ও ধ্বংস করে এক ধরনের অপ্রতিসম অর্থনৈতিক প্রতিরোধ নীতি বাস্তবায়ন করেছে। এই ধরনের সুনির্দিষ্ট সামুদ্রিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিশোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি করিডোরগুলোতে অপারেশনাল ঝুঁকি ও অস্থিরতা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কাসেম বসির ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল এর পরিসীমা বা যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষমতা নয়, বরং এটি ফ্লাইটের শেষ মুহূর্তে কীভাবে একটি চলমান লক্ষ্যবস্তুকে খুঁজে বের করে এবং আঘাত হানে সেটাই মূল বিষয়। ঐতিহ্যবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিপরীতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর এটিকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। প্রাক-নির্ধারিত স্থানাঙ্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পক্ষে চলমান যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানা কঠিন, কারণ অস্ত্রটি পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যবস্তু সরে যেতে পারে। কিন্তু ইলেক্ট্রো-অপটিক্যালি নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রটি টার্মিনাল ধাপে পৌঁছানোর পর দৃষ্টিশক্তি লাভ করে। এটি লক্ষ্য এলাকার চিত্র বা ইমেজরির সাথে সংরক্ষিত রেফারেন্স ডেটার তুলনা করে এবং লক্ষ্যবস্তুর নড়াচড়ার সাথে সাথে এর ফ্লাইট পথ সংশোধন করে। এই প্রযুক্তির কারণে প্রচলিত ইলেকট্রনিক জ্যামিং অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়া ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সেন্সরগুলো নিষ্ক্রিয় প্রকৃতির হওয়ায় এগুলো কোনো সনাক্তযোগ্য সিগন্যাল নির্গত করে না, যা রাডার-ভিত্তিক ব্যবস্থার মতো লক্ষ্যবস্তু দ্বারা সহজে ধরা পড়ে না।
তবে টার্মিনাল গাইডেন্স কেবল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের শেষ অংশটুকুই সমাধান করে। এর আগে ইরানকে শত শত কিলোমিটার সমুদ্রজুড়ে একটি চলমান যুদ্ধজাহাজকে খুঁজে বের করতে, শনাক্ত করতে এবং ক্রমাগত ট্র্যাক করতে হয়। ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সেন্সরযুক্ত কাসেম বসির ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ কিল ওয়েবের চূড়ান্ত সংযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা রাশিয়া এবং চীনের পরিপূরক গোয়েন্দা, নজরদারি এবং রিকনেসান্স বা আইএসআর ক্ষমতাগুলোকে একীভূত করে।
এই সমস্ত ক্ষমতা একত্রে একটি স্তরীভূত আক্রমণ শৃঙ্খল তৈরি করে। চীনা সিস্টেমগুলো বিস্তৃত সামুদ্রিক এলাকা খুঁজে বের করে এবং ট্র্যাকের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। কাসেম বসির এই বিশাল নেটওয়ার্কের একেবারে ধারালো প্রান্তে অবস্থান করছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান বা তার মিত্রদের কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানার খবর পাওয়া যায়নি, তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি উল্লেখযোগ্য বিপজ্জনক ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় হুতিদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে পতিত হয়েছিল। মার্কিন রণতরীগুলো উচ্চ গতির কৌশল, এজিস ডেস্ট্রয়ার ও ক্রুজার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র, প্রলোভন সৃষ্টিকারী বস্তু এবং ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া তাদের শক্তিশালী নির্মাণশৈলী পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার ছাড়া কোনো শত্রুর পক্ষে এগুলোকে ডুবিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
তবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ডোবানোর প্রয়োজন নেই, কেবল একটি নিখুঁত আঘাতই সেগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য করতে পারে। ডেস্ট্রয়ার এবং ক্রুজারগুলোও একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ একটি গণ-আক্রমণ তাদের সীমিত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে নিঃশেষ করে দিতে পারে এবং পরবর্তী আঘাতের মুখে তাদের অরক্ষিত করে তুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালির বাইরে উত্তেজনা বাড়িয়ে ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে অতিরিক্ত নৌবাহিনী মোতায়েনে বাধ্য করতে পারে, যা মার্কিন সফলতার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের ২৫ শতাংশ তেল সরবরাহ কার্যকরভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা বাব আল-মান্দেবের মতো বিকল্প শিপিং রুটগুলোকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে কেবল মার্কিন বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তাদের দুটি পৃথক ভৌগোলিক সংকীর্ণ পথে বিভক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কেন্দ্রস্থলে হুথিরা পেরিম দ্বীপ দখল করায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ১২ শতাংশ হুমকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে হতে পারে, যা এই সংঘাতপূর্ণ রণক্ষেত্রে মার্কিন জাহাজগুলোর চলাচলের পরিসরকে সীমিত করে তুলবে এবং ইরানি বা হুথি বাহিনীর সফল আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।
মার্কিন রণতরীতে একটি সফল আঘাত এই সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র এর জবাবে কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে গিয়ে ইরানি রাষ্ট্রকে সমর্থনকারী অবকাঠামোগুলোর ওপর আক্রমণ সম্প্রসারণ করে। তবে ইরানও এর পাল্টা জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে অবস্থিত ডিস্যালিনেশন বা লবণাক্ততা দূরীকরণ প্লান্টগুলোতে আঘাত হানতে পারে, যা জলসংকটগ্রস্ত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের মাত্র তিন শতাংশ পানির চাহিদা এই প্লান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যা উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় ইরানকে অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলিদের লাগাতার হামলা সত্ত্বেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রচারণা টিকিয়ে রাখতে এবং অস্ত্রাগার পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রধান ভূগর্ভস্থ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হওয়ার পর ইরান মজুত করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ সুবিধায় তরল ও সলিড-ফুয়েল চালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে চলেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে ইরানের কাছে বিদ্যমান হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও আরও শত শত বা হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মতো যন্ত্রাংশ মওজুদ রয়েছে। উৎপাদনের এই গভীরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এমনকি সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও বারবার নিক্ষেপ করা হলে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। প্রতিরক্ষাকারীদের প্রতিটি আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করতে হয়, কিন্তু আক্রমণকারীদের সফল হওয়ার জন্য কেবল কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার প্রয়োজন হয়। ইরান যদি এই ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়, তবে কৌশলগত প্রশ্নটি আর কেবল মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো পৃথক আক্রমণগুলো প্রতিহত করতে পারে কিনা তাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রশ্ন হবে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌবহরকে বিক্ষিপ্ত না করে এবং সীমিত ইন্টারসেপ্টরগুলো নিঃশেষ না করে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে কি না।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এনজিটি