অণুশৈবালের প্রাদুর্ভাবে সুপেয় পানির সংকটে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক

ভূমধ্যসাগরে কয়েক মাইলজুড়ে ‘মাইক্রোঅ্যালগি’ বা অণুশৈবালের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর কারণে ইসরায়েলের কয়েকটি বড় লবণাক্ত পানি পরিশোধন

2026-09-05T17:33:44+06:00
2026-09-05T17:33:44+06:00
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩

অণুশৈবালের প্রাদুর্ভাবে সুপেয় পানির সংকটে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ০)

ভূমধ্যসাগরে কয়েক মাইলজুড়ে ‘মাইক্রোঅ্যালগি’ বা অণুশৈবালের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর কারণে ইসরায়েলের কয়েকটি বড় লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে দেশটির পানীয় জলের প্রধান উৎস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইক্রোঅ্যালগি হলো খুব ছোট জলজ জীব, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানিতে থাকা পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে এগুলো দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। 

ইসরায়েলের জাতীয় পানি সংস্থা মেকোরোটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি উপকূলীয় লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি রবিবার বন্ধ হয়ে যায়।
এসব কেন্দ্রে সমুদ্রের পানি পরিশোধন করে পানযোগ্য করা হয়। পরে কয়েকটি কেন্দ্র আংশিকভাবে চালু হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র একটি কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চলছিল। ৭৮ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম দেশটি সুপেয় পানির সংকটে পড়েছে।

মেকোরোটের মুখপাত্র লিওন গুটম্যান বলেন, ইসরায়েলে এর আগে এত বড় আকারে এমন ঘটনা দেখা যায়নি।
তবে তিনি জানান, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকায় পানীয় জলের সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। ইসরায়েলের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটি পানীয় জলের জন্য সমুদ্রের পানি পরিশোধনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইসরায়েল একটি শুষ্ক দেশ, যেখানে বড় নদী নেই এবং বৃষ্টিপাতও তুলনামূলক কম। বর্তমানে দেশটির পানীয় জলের অন্তত ৬৫ শতাংশ সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধনের মাধ্যমে আসে।

ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণার সহযোগী অধ্যাপক এদো বার-জিভ বলেন, সপ্তাহের শুরুতে দেশটির উপকূলজুড়ে বিপুল পরিমাণ ভাসমান পদার্থ দেখা যায়। পরে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, এর বড় অংশ মাইক্রোঅ্যালগি।

বার-জিভের ধারণা, শৈবালের এই বিস্তার অন্তত এক ডজন মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি নীল নদের বদ্বীপ এলাকা থেকে শুরু হয়ে সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে উত্তর দিকে ইসরায়েলের উপকূলে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত ২০ বছর ধরে উপকূলের পানির মান পরীক্ষা করছেন বার-জিভ। তিনি বলেন, এত বড় আকারের শৈবালের বিস্তার তিনি আগে কখনো দেখেননি। ইসরায়েলের বেশিরভাগ লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রথমে পানির বড় কণা ও দূষিত পদার্থ সরানো হয়। এরপর বিশেষ ঝিল্লির মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত করা হয়। ওই ঝিল্লি লবণ, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য ক্ষুদ্র কণা আটকে দিয়ে পরিষ্কার পানি তৈরি করে।

তবে পানিতে শৈবাল ও এর তৈরি বিভিন্ন পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে এসব ঝিল্লি দ্রুত নষ্ট বা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, পানিতে ভাসমান পদার্থের পরিমাণ বেশি হলে পরিশোধন ব্যবস্থা তা সামাল দিতে পারে না।

এ ধরনের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে বড় ধরনের ক্ষতিকর শৈবাল বৃদ্ধির কারণে ওই অঞ্চলের কয়েকটি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরিশোধন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পানির ঘাটতি পূরণে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। মেকোরোটের গুটম্যান জানান, গ্যালিলি সাগর থেকে পানি সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির কূপ চালু করা হয়েছে এবং জাতীয় পানি মজুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

কয়েকটি শহরে সাময়িকভাবে কিছু বিধিনিষেধও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাগানে পানি দেওয়া ও সুইমিং পুলে পানি ভরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন কৃষকেরা। বিশেষ করে যারা সেচের কাজে পানযোগ্য মানের পানি ব্যবহার করেন। পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারকারী কৃষকেরা তুলনামূলকভাবে কম সমস্যায় পড়েছেন।

গুটম্যান বলেন, ঘটনাটি গ্রীষ্মকালে হওয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়েছে। কারণ এ সময় ইসরায়েলে পানির চাহিদা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি থাকে। ইসরায়েল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড লিমনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক বাস্তুবিদ তামার গাই-হাইম বলেন, পানিতে থাকা পুষ্টি, তাপমাত্রা, আলো, স্রোত ও পানির মিশ্রণের মতো পরিবেশগত বিষয়গুলো যখন শৈবালের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘ব্লুম’ বলা হয়।

মেকোরোটের মতে, এবারের শৈবাল বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু অস্বাভাবিক পরিস্থিতি একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে ছিল একটি সামুদ্রিক ঝড়। ঝড়ের কারণে পানিতে ভাসমান পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। একই সময়ে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হয়ে যায়।

বার-জিভ বলেন, শৈবাল বা জেলিফিশের কারণে এর আগে পরিশোধন কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। তবে উপকূলের বড় একটি অংশজুড়ে একই সময়ে একাধিক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সমুদ্রেও। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। শক্তিশালী ঝড়ের কারণে পয়ঃবর্জ্য ও সারসহ বিভিন্ন দূষিত পদার্থও সমুদ্রে মিশছে। এসব কারণে বড় আকারে শৈবাল বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ঘটনা শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়, এটি পানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও সামনে এনেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমুদ্রের পানি পরিশোধনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। তবে একটি কেন্দ্রীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না। সামরিক হামলা ও সাইবার হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এর আগে লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে। বিভিন্ন দেশে হ্যাকাররাও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বার-জিভ বলেন, ‘লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়বে কি না, সেটি নয় বরং প্রশ্ন হলো, কখন এমন ঘটনা ঘটবে। তেল ছড়িয়ে পড়লে শৈবালের প্রাদুর্ভাবের তুলনায় এসব পরিশোধন কেন্দ্র দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হতে পারে। কারণ তেল পানির পরিশোধন ব্যবস্থার জন্য বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করতে পারে।’


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এনজিটি








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ