চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে পুরো বিশ্ব, জাতিসংঘের সতর্কতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

আবহাওয়া ও পরিবেশ

বিশ্ব এখন চরম আবহাওয়ার একটি ‘বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এল নিনোর

2026-09-04T10:47:24+06:00
2026-09-04T10:47:24+06:00
শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩

চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে পুরো বিশ্ব, জাতিসংঘের সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৭ এএম   (ভিজিট : ৭)

বিশ্ব এখন চরম আবহাওয়ার একটি ‘বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এল নিনোর প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হতে শুরু করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলছে, এবারের এল নিনো ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে ও এর প্রভাব অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল নিনো আমাদের চোখের সামনে আরও বড় আকার নিচ্ছে। তার মতে, পৃথিবী এমন এক পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছে, যেখানে জলবায়ু ও আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি ক্রমেই অচেনা হয়ে উঠছে। এল নিনোর সঙ্গে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

কোথাও খরা, কোথাও বন্যা


এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে দেয়। এর প্রভাবে কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়ে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও শক্তিশালী টাইফুনের আশঙ্কা তৈরি হয়। ডব্লিউএমও বলছে, আগামী কয়েক মাসে এসব প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। প্রধান পর্যবেক্ষণ এলাকায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাসিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এমন হলে এটি ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খরার আশঙ্কা

ডব্লিউএমও বলছে, আগামী কয়েক মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা ও উত্তর দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে। কম বৃষ্টিপাতের প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে। পানামা খালে জাহাজ চলাচল ১০ শতাংশের বেশি কমানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সমুদ্রের গভীরেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা

শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠেই নয়, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির নিচের স্তরেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি রয়েছে। এছাড়া ভারত মহাসাগর, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিক এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলের কিছু অংশেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ

সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একের পর এক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ হয়েছে। এতে ব্যাপক প্রবাল বিবর্ণতা ও শৈবাল বিস্তার ঘটেছে এবং ‘নজিরবিহীন ক্ষতি’ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক অ্যালিস্টার হবডে বলেছেন, এল নিনো সাধারণত এমন চরম উষ্ণতা তৈরি করে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

তবে এবারের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে পারে। এতে প্রবালগুলো কিছুটা পুনরুদ্ধারের সময় পাবে। অবশ্য, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে গত বছর শৈবালের ব্যাপক বিস্তার হয়েছিল। এবারও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আগের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের সময় দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়ায় ক্ষুধার্ত পেঙ্গুইন, মাছের ব্যাপক মৃত্যু, শ্বাসরোধকারী শৈবাল এবং জেলিফিশের বিস্তার দেখা গিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়া সামুদ্রিক সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে মৎস্য খাতের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং প্রবালের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এবারের এল নিনো নজিরবিহীন হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যালিস্টার হবডে।

পানামা খালে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা

প্রতি বছর প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ পানামা খাল ব্যবহার করে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পানামার আয়েরও বড় উৎস। খাল থেকে দেশটি বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আয় করে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে পানামা খালে পানির স্তরও কমে যেতে পারে। ফলে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন হতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল

ইন্দোনেশিয়ায় চলতি শুষ্ক মৌসুমে এক লাখ ৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকায় দাবানল ছড়িয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো দেশটিও এবার দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের মুখে পড়েছে। মধ্য কালিমান্তানের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দাবানল চলছে। ধোঁয়া এত ঘন হয়ে উঠেছে যে বাইরে বের হলে চোখ জ্বালা করছে এবং তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ ক্লাউড-সিডিং বিমান ব্যবহার করে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করছে। জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহারের অভিযোগে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

চীনে শক্তিশালী টাইফুনের আশঙ্কা

চীনে চলতি বছর সাতটি টাইফুন স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে বলে দেশটির বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর সম্পর্ক রয়েছে বলে তারা মনে করছেন। জুলাই মাসেই চীনে বাভি, নুল ও মেসাক নামের তিনটি টাইফুন আঘাত হানে। এতে কয়েক ডজন মানুষ মারা যান। আগস্টে টাইফুন ডলফিনের আঘাতে ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের কারণে ১০ লাখের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়।

পূর্ব আফ্রিকা ও আমেরিকায় বন্যার ঝুঁকি


শুধু খরাই নয়, এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কাও রয়েছে। পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।

ডব্লিউএমও-এর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, খরা ও বন্যার কারণে ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এল নিনো শক্তিশালী হলে এসব প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

পেরু ও ইকুয়েডরে ভূমিধসের আশঙ্কা

প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থানের কারণে পেরু এল নিনোর প্রভাবে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে পেরু, ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু এলাকায় এল নিনোর সময় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দিয়েছে। শহরাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় জোর

প্র্যাক্টিক্যাল অ্যাকশন- এর জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান মিগেল আরেস্তেগুই বলেছেন, এল নিনো নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সেটি আতঙ্কে পরিণত না করে প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। সংস্থাটি বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কাজ করে নদীর পানির উচ্চতা, বন্যার ঝুঁকি ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এর লক্ষ্য হলো চরম আবহাওয়ার আগে মানুষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

পেরুর উপকূলে মার্কিন চিকিৎসা সহায়তা

এল নিনোর সম্ভাব্য তীব্র প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র গত মাসের শেষে পেরুর উপকূলে ইউএসএনএস কমফোর্ট জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও কারিগরি সরঞ্জাম দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শুধু এল নিনো নয়, কাঠামোগত সমস্যাও বড় কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো একা কোনো সংকট তৈরি করে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন, দুর্বল পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো চরম আবহাওয়ার ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

ডব্লিউএমও ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, তাই এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা জরুরি। - সূত্র: বিবিসি


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ