প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩৭ পিএম (ভিজিট : ৭)

শহরের রাস্তায় রাস্তায় এখন ব্যস্ততা। কোথাও তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও যেন দম ফেলার সময় নেই। পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত পৌরসভার কর্মীরা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো আগামী রোববার ও সোমবার (৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর) দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন তিনি। তাকে ঘিরে পুরো জেলায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বাড়তি কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস।
রাষ্ট্রপতির সফরকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চলছে প্রস্তুতি। নির্মাণ করা হচ্ছে তোরণ, করা হচ্ছে আলোকসজ্জা। পাশাপাশি চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি। রাষ্ট্রপতিকে বরণ করে নিতে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও প্রস্তুত হচ্ছেন।
তবে এই আয়োজনের বাইরে সাধারণ মানুষের আগ্রহটা যেন আরও ব্যক্তিগত। কারও কাছে তিনি জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ, কারও কাছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা, আবার কারও কাছে তিনি নিজের শহরের ‘আলমগীর স্যার’। রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজের মাটিতে তার এই ফিরে আসা তাই ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছে একই সঙ্গে গর্ব, আনন্দ আর আবেগের।
সফরের প্রথম দিন রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে তাঁর অবতরণের কথা রয়েছে। সেখান থেকে তিনি যাবেন জেলা সার্কিট হাউসে। সেখানে গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর তার গন্তব্য শহরের সেনুয়া পাড়া। সেখানকার পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত বাবা সাবেক মন্ত্রী মরহুম মির্জা রুহুল আমীন (চোখামিয়া) ও মা ফাতেমা বেগমের কবর জিয়ারত করবেন তিনি।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার নিজের জেলায় এসে বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাঁড়ানোর এই মুহূর্তটিও তার সফরের অন্যতম আবেগঘন অংশ হয়ে উঠতে পারে। কবর জিয়ারত শেষে রাষ্ট্রপতি যাবেন শহরের কালীবাড়িতে তাঁর নিজ বাসভবনে। সেখানে দুপুরের খাবার গ্রহণ ও কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন।
বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। সেখানে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বড় ধরনের আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সংবর্ধনা শেষে নিজ বাসভবনে ফিরে গণ্যমান্য ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন রাষ্ট্রপতি। সেখানেই তার রাতযাপনের কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) নিয়ে ঠাকুরগাঁওবাসীর আগ্রহ আরও বেশি। কারণ এদিন ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ‘ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে নানা সময়ে আন্দোলন, সভা-সমাবেশ করেছেন স্থানীয়রা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর এবার স্থাপন করবেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ঠাকুরগাঁওয়েরই সন্তান।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে রাষ্ট্রপতি নিজ বাসভবনে ফিরে দুপুরের খাবার গ্রহণ ও বিশ্রাম করবেন। পরে সার্কিট হাউসে গিয়ে গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন। এরপর হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে ঠাকুরগাঁও ছাড়ার কথা রয়েছে তাঁর।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে জেলাজুড়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। সফরের সম্ভাব্য স্থান, যাতায়াতের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
ডা. আবু মো. খয়রুল কবির বলেন, তিনি শুধু রাষ্ট্রপতি নন, তিনি আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি নিজের মানুষের কাছে ফিরছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আবেগের মুহূর্ত। আমরা চাই, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে তাঁকে স্বাগত জানাক। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বরণ করে নিতে আমরা ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম আগমন আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ, গর্ব ও আবেগের বিষয়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এই জেলার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে সবসময় সম্পৃক্ত ছিলেন। এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি যখন নিজের মানুষের কাছে ফিরছেন, তখন এ সফর নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, তাকে স্বাগত জানাতে জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরের প্রতিটি কর্মসূচি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, আগামী ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরের প্রতিটি কর্মসূচি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর, সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সফরের নির্ধারিত স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির যাতায়াত ও কর্মসূচি ঘিরে সার্বিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সফর যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরের প্রতিটি কর্মসূচি, যাতায়াতের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এসব এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার সফরকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের চলাচল ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গত ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অবরপ্রাপ্ত) অলি আহমদকে পরাজিত করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদ সদস্য, বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই