প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম (ভিজিট : ০)

আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, একাধিক প্রার্থী থাকলে ওই দিন বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে ভোট গ্রহণ হবে। এই নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন—এবং তাঁদেরই কেউ কেউ এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায়ও যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতীত রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেসব কর্মকর্তা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বর্তমান ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অতীত কর্মকাণ্ড, নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি ও প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আসমা দিলারা জান্নাতকে ঘিরে প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আসমা দিলারা জান্নাতকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাঁদের ভাষ্য, তিনি সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান ও কবিতা খানমের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালে আহসান হাবিব খানের একান্ত সচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের তথ্য সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে কমিশনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের বর্তমান দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে।
মুনীর হোসাইন খানের পদায়ন নিয়েও আলোচনা
অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন মো. মুনীর হোসাইন খানও। সরকারি নথি অনুযায়ী তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব ওয়াহিদুল হক খানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে তিনি বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, ঢাকার সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, এরপর কুমিল্লা ও চট্টগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
তবে তাঁর পদায়নে পারিবারিক সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সরকারি নথিতে অবশ্য তাঁর বিভিন্ন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে; ২০২৪ সালের কুমিল্লা উপজেলা নির্বাচনসংক্রান্ত নথিতেও তাঁকে সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
রাশেদুল ইসলামও আলোচনায়
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (নির্বাচন পরিচালনা-১) রাশেদুল ইসলামও রয়েছেন আলোচনায়। ইসির বর্তমান কর্মকর্তাদের তালিকায় তাঁকে একই পদে দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং তিনি তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তবে এই অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বর্তমান কমিশনের অধীনেও নির্বাচন পরিচালনা-১ শাখায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন—যা সরকারি কার্যক্রম-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক নথিপত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে।
২০ কর্মকর্তার তালিকায় তিনজন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনায় সিইসিকে সহায়তার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ২০ কর্মকর্তার তালিকায় এই তিন কর্মকর্তার নাম থাকার বিষয়টি সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাঁদের প্রশ্ন—অতীতে যাঁদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক বা অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলো? দায়িত্ব বণ্টনের আগে তাঁদের অতীত ভূমিকা ও নিরপেক্ষতার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না, তা-ও জানতে চান তাঁরা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্বাচন না হলেও এটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। ফলে এতে যুক্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত দায়িত্ব, বর্তমান পদায়ন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁদের নির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, দায়িত্ব বণ্টনে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সুবিধা পেয়েছেন কি না—এই সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব কমিশনেরই। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া, আর ভিত্তিহীন হলে তথ্য-প্রমাণসহ তা স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা জরুরি।
২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে তাই প্রশ্নটি এখন শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই