আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনে হতাশা-অসন্তুষ্টি

ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:

জাতীয়

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে সরকার আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান

2026-07-26T13:53:48+06:00
2026-07-26T13:53:48+06:00
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রশাসনে হতাশা-অসন্তুষ্টি
ডেল্টা টাইমস ডেস্ক:
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ৬)

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে সরকার আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন বোয়েসেল, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, বিআইডব্লিউটিসিসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণায় প্রশাসনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। প্রশাসনে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব নিয়োগের তথ্য জানানো হয়। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ ছাড়া বাকি ১১টি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার।

নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে মো. সালাহউদ্দিন সরকার, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হিসেবে মো. কামরুজ্জামান, বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. শামসুজ্জামান, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজী রওনাকুল ইসলাম, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. জাকির হোসেন, বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. মামুন হাসান। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন মো. সামসুল আলম।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য এই নিয়োগ কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্তদের অন্য কোনো সরকারি, আধা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি, পেশা বা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তা ত্যাগ করতে হবে।

ক্ষোভ জানিয়ে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক বছর ধরেই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর, সংস্থা ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। এতে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। তাদের মতে, এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক ক্যারিয়ার-কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, একটি ক্যাডার সার্ভিসে কর্মকর্তাদের প্রধান অনুপ্রেরণা হলো মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যদি বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে পূরণ হয়, তাহলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করার পর অনেক কর্মকর্তা অবসরের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পদে এভাবে ধারাবাহিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলে প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের পরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও এটি হওয়া উচিত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে। তবে যেখানে নিয়মিত পদোন্নতির মাধ্যমে যোগ্য কর্মকর্তা পাওয়া সম্ভব, সেখানে ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে ক্যাডার ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাদের মতে, প্রশাসনের দক্ষতা শুধু ব্যক্তির যোগ্যতার ওপর নয়, একটি সুসংগঠিত ও পূর্বানুমানযোগ্য ক্যারিয়ার ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে। সেই কাঠামো দুর্বল হলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রশাসনের পেশাদারত্ব ও কর্মোদ্দীপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে জনপ্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, বিশেষ অভিজ্ঞতা, চলমান সংস্কার কার্যক্রম কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনে সরকার অনেক সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রয়োজন থাকলে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যাও প্রকাশ্যে তুলে ধরা উচিত। এতে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যেও বৈষম্য ও বঞ্চিত হওয়ার দুঃখ কমবে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এটি যেন ব্যতিক্রম হিসেবেই থাকে, নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত যেন না হয়। তার মতে, মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কোন পদে, কী কারণে এবং কোন মানদণ্ডে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের আরও স্বচ্ছ অবস্থান নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত কর্মকর্তাদের ন্যায্য পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা হলে প্রশাসনের পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও দক্ষতা আরও শক্তিশালী হবে। সূত্র : খবরের কাগজ


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ