প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১০:২১ এএম (ভিজিট : ১৫)

নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের ফাইনালের রেশ কেটে গেছে। যে মহারণে আর্জেন্টিনা ঠিক নিজের চেনা রূপে ধরা দিতে পারেনি, তাদের ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে স্পেন।
তবে মাঠের লড়াই শেষ হলেও একটা বিতর্ক এখনো থামেনি—অতিরিক্ত সময়ের ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের করা গোলটি কেন বাতিল করা হলো?
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়েছে স্পেন, কিন্তু গোলের দেখা পাচ্ছিল না। অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে বল জালে জড়িয়ে ডেডলক ভাঙেন নিকো। কিন্তু রেফারি স্লাভকো ভিনসিক নিকোলাস ওতামেন্দির সঙ্গে মৃদু স্পর্শের অজুহাতে ফাউলের বাঁশি বাজান।
লামিন ইয়ামালের নিখুঁত এক থ্রু বল খুঁজে নিয়েছিল আর্জেন্টাইন ডি-বক্সের ভেতরে থাকা মিকেল মেরিনোকে। ওতামেন্দিকে এড়িয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন মেরিনো, এরপর বল পান নিকো। তিনি ঠান্ডা মাথায় আগুয়ান এমিলিয়ানো মার্টিনেজের নিচ দিয়ে বল জালে জড়ান।
মেরিনোর অপরাধটা কী ছিল? ওতামেন্দির পায়ে সামান্য একটু পা লেগেছিল—সাধারণত ডি-বক্সের ভেতরে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে রেফারিরা এর চেয়ে অনেক বড় ফাউলও এড়িয়ে যান। এমনকি রিপ্লেতে দেখা গেছে ওতামেন্দি নিজেই মেরিনোকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
বাংলাদেশি সম্প্রচারের ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠেও ছিল চরম বিস্ময়, ‘স্পেনের খেলোয়াড়রা হতভম্ব। এমনকি আমিও স্তম্ভিত।’
তবে সিদ্ধান্তটি যতটা না রহস্যময় ছিল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ভিএআর কেন এই ঘটনায় নীরব রইল? এই টুর্নামেন্টে এর চেয়েও সাধারণ ঘটনায় যেখানে ভিএআর হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানে এই গোলটির ক্ষেত্রে রিভিউ কেন দেখা হলো না?
ভিএআর ও আর্জেন্টিনার 'ভাগ্য'
এই বিতর্কের গভীরতা বুঝতে হলে টুর্নামেন্টের পেছনের কিছু ম্যাচে চোখ ফেরাতে হবে। শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার অর্ধে হাইসেম হাসানের দুর্দান্ত একক দৌড় থেকে বল পেয়ে মোস্তফা জিকো মিশরের লিড দ্বিগুণ করেছিলেন। কিন্তু ভিএআর অনেক আগের এক ঘটনায় লিসান্দ্রো মার্টিনেসের ওপর ফাউল খুঁজে পাওয়ায় গোলটি বাতিল হয়।
নিয়মের বই অনুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল, কারণ আক্রমণের শুরু থেকে গোল হওয়া পর্যন্ত যেকোনো ফাউল ভিএআর দেখতে পারে। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ভিএআর যেন বেছে বেছে কিছু ঘটনায় নাক গলিয়েছে, যার বেশির ভাগই গেছে আর্জেন্টিনার পক্ষে।
যেমন গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার পেছন থেকে নিকোলাস সাইওয়াল্ডকে ধাক্কা দিয়ে বল কেড়ে নেন। সেখান থেকেই লিওনেল মেসি গোল করেন। রেফারি বিষয়টিকে ফাউল নাও ভাবতে পারেন, কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো ভিএআর মাঠের রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউ দেখার পরামর্শ পর্যন্ত দেয়নি। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ২-০ ব্যবধানে।
ফাইনালও এর ব্যতিক্রম ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেই হলুদ কার্ড দেখেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস। এরপর তিনি রদ্রিগোর ওপর এক কঠিন ট্যাকলসহ আরও তিনটি ফাউল করেন। রিপ্লেতে দেখা গেছে রদ্রিগোই আগে বলে পা ছোঁয়ানোর পর পারেদেস তাকে লাথি মারেন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক একই অপরাধে লুকাস দিনিয়ে স্পেনের লামিন ইয়ামালকে ফাউল করায় পেনাল্টি পেয়েছিল স্পেন। কিন্তু ফাইনালে পারেদেসের ক্ষেত্রে ভিএআর কোনো ইশারা করেনি।
পরিসংখ্যানের ধোঁয়াশা ও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
অবশ্য সব সিদ্ধান্তই যে আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে, তা নয়। ফাইনালে দানি ওলমো ক্লিয়ার করতে গিয়ে মেসির পায়ে আঘাত করলেও রেফারি বা ভিএআর কেউ সাড়া দেয়নি। এমনকি ৯৩ মিনিটে এনসো ফার্নান্দেসের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্তটিও বেশ বিতর্কিত ছিল। পাউ কুবার্সির পায়ে তার সামান্য স্পর্শ লেগেছিল, যা কুবার্সির অতি নাটকীয়তায় লাল কার্ডে রূপ নেয়।
তবুও পুরো টুর্নামেন্টের সামগ্রিক চিত্র অন্য কথা বলে। কিছু পরিসংখ্যান এই বিতর্ককে আরও উস্কে দেয়:
● দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচেই যেখানে ৩ জন লাল কার্ড দেখেছিলেন, সেখানে আর্জেন্টিনা একমাত্র দল যাদের বিপক্ষে টুর্নামেন্টে একটি সিদ্ধান্তও ভিএআর দিয়ে পাল্টানো হয়নি।
● ফাইনালের আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা প্রতি ১৯.৬টি ফাউল করার পর মাত্র একটি করে কার্ড (হলুদ বা লাল) দেখেছে।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে 'ভদ্র' দল হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
এর মানে এই নয় যে রেফারিংয়ের পেছনে আর্জেন্টিনার হাত ছিল। পেশাদার দল হিসেবে তারা নিয়মের শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে খেলেছে। কিন্তু যখনই কোনো ফিফটি-ফিফটি সিদ্ধান্ত এসেছে, তা আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। আর এখানেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
স্পেন যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ ছেড়েছে। তাদের নান্দনিক ফুটবলই তাদের এই মুকুট এনে দিয়েছে। তবে এই বিশ্বকাপের উন্মাদনা যখন কেটে যাবে, তখন ফুটবল ইতিহাস স্পেনকে মনে রাখার পাশাপাশি মাঠের রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতাহীনতা এবং ভিএআর-এর পক্ষপাতমূলক ব্যবহারের বিতর্ককেও মনে রাখবে।
খেলার ফলাফল যা-ই হোক, এই প্রশ্নগুলো ফুটবল বিশ্ব থেকে এত সহজে হারিয়ে যাবে না।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই