প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৮ এএম (ভিজিট : ৩২)

টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশের অন্তত সাতটি জেলায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নদী তীরবর্তী নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ৫ দিন এসব নদ-নদীর পানির বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এই অবস্থায় আগামী তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিনে (২০-২২ জুলাই) ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদ-নদীর কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার কিছু পয়েন্টে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।
এছাড়া বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় কীর্তনখোলা, লোয়ার-মেঘনা, পশুর, ইছামতি, কর্নফুলী, লিটল ফেনী, নোয়াখালী খাল ইত্যাদি নদীগুলোয় বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোয়ার বিরাজমান রয়েছে। আগামী একদিন এসব নদীগুলোয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোয়ার বিরাজমান থাকতে পারে বলেও জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
ইতোমধ্যে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে।
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য বেড়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই, মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী দুদিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা ছাড়াতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। আবার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বাড়লেও এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। আগামী পাঁচ দিনে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদনদীর পানিও বাড়তে পারে। তবে সেগুলো বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার কোনো নদীর পানি এখনও বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে ভারতের আসাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি আরও বাড়তে পারে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এবার বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা কম। ফলে নদীতীরবর্তী কিছু এলাকায় পানি উঠলেও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, জেলার সব নদীর পানি বাড়ছে। তিস্তার পানি কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তবে যমুনার পানি বিপৎসীমার নিচেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী দুই-তিন দিন নদীর পানি আরও বাড়বে এবং নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছিল। এবারও উজানে বৃষ্টির কারণে একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভারতের উজানে বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরও বাড়বে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখনও নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতি
সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদী ছাতক এবং কুশিয়ারা নদী মৌলভীবাজারের শেরপুর পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। আত্রাই, করতোয়া, ছোট যমুনা ও যমুনেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমেছে। তবে নওগাঁর কয়েকটি পয়েন্টে আত্রাই ও ছোট যমুনা এখনও সতর্কসীমায় রয়েছে। জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ঢাকা ও আশপাশের নদীগুলোর মধ্যে ধলেশ্বরীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও টঙ্গী খালের পানি স্থিতিশীল রয়েছে।
এদিকে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিন ধরে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অস্বাভাবিক জোয়ারে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে বিভিন্ন লঞ্চ ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে ও পন্টুন। এতে যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ওঠানামা করতে হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, মেঘনা, বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা নদীর একাধিক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
কাপ্তাই হ্রদের ১৬ স্লুইসগেট খোলা
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়ায় গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, গেট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে ছাড়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট দিয়ে আরও ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান বলেন, পানি ছাড়ার আগে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল ১০৪ দশমিক ০৯ ফুট (এমএসএল)। হ্রদের বিপৎসীমা ধরা হয় ১০৮ ফুট।
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই