
প্রতীকী ছবি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ 'চিকেনস নেক' বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে সক্রিয় হয়েছে নয়াদিল্লি। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই করিডরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করতে পশ্চিমবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ রোধ এবং বিএসএফের জন্য জমি হস্তান্তরের অগ্রগতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী এই করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুশ্চিন্তায় রয়েছে দেশটি। কারণ, এই সংকীর্ণ করিডরের মাধ্যমেই ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও ত্রিপুরার সংযোগ বজায় রয়েছে। এসব রাজ্যে প্রয়োজনীয় রসদ, পণ্য ও সামরিক সরঞ্জামও এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে করিডরটি অচল হয়ে পড়লে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক অখণ্ডতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চীন সীমান্তের মিলনস্থলে অবস্থিত এই করিডরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। এ লক্ষ্যে সামগ্রিক পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন অমিত শাহ। শনিবার (১৮ জুলাই) শিলিগুড়ির উত্তরকন্যা সচিবালয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা, সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন এবং অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের মুখ্য সচিব, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক (ডিএম) এবং পুলিশ সুপারদের (এসপি) উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কয়েক দফা শিলিগুড়ি করিডর পরিদর্শন করেছেন।
নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সুপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে শহরটিকে 'ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন' (এনএসআর) বা জাতীয় কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে নয়াদিল্লি। এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈরী সম্পর্কের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে রাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই জট কেটেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তরে গড়িমসির অভিযোগ তুলেছিল তখনকার বিরোধী দল বিজেপি। তবে নতুন রাজ্য সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় গতি এসেছে। একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজও দ্রুত এগোচ্ছে।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বিএসএফের কাছে ১ হাজার ২৫ দশমিক ৭৫ একর জমি হস্তান্তর করেছে। এই জমির মোট দৈর্ঘ্য ১৭২ দশমিক ৬০৯২২ কিলোমিটার। তাঁর আশা, এই উদ্যোগ সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি জমি হস্তান্তর করা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং সবচেয়ে কম জলপাইগুড়িতে। জেলাভিত্তিক হিসাবে মালদহে ১৭৬ দশমিক ৭৮ একর, কোচবিহারে ১৩৫ দশমিক ৩৩ একর, দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৬ দশমিক ৪১ একর, উত্তর দিনাজপুরে ৬ দশমিক ৬১ একর, দার্জিলিংয়ে ৪ দশমিক ৩১ একর এবং জলপাইগুড়িতে ২ দশমিক ১৭ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।
উত্তরকন্যার বৈঠকে এই জমি হস্তান্তর এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন অমিত শাহ।
ভারতের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলা মিলিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নদী ও জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার সীমান্তে এখনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
তবে অরক্ষিত নদী সীমান্তগুলোতে বিএসএফের টহল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে কোচবিহারে সবচেয়ে দীর্ঘ, প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এরপর দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৫০ কিলোমিটার এবং উত্তর দিনাজপুরে ২২৭ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি নেপাল-ভারত সীমান্তের ১ হাজার ৭৫১ কিলোমিটার এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।