আলোচনার মধ্যেই গালিবাফ-আরাঘচিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচকদের হত্যা করতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল

2026-07-03T10:50:58+06:00
2026-07-03T10:53:27+06:00
শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

ইরানের কাছে ফাঁস করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র
আলোচনার মধ্যেই গালিবাফ-আরাঘচিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫০ এএম  আপডেট: ০৩.০৭.২০২৬ ১০:৫৩ এএম  (ভিজিট : ১৪)
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আব্বাস আরাঘচিকে হত্যা করতে চেয়েছিল ইসরায়েল। ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আব্বাস আরাঘচিকে হত্যা করতে চেয়েছিল ইসরায়েল। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচকদের হত্যা করতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল ওয়াশিংটন। ঠিক সেই সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছিল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফকে হত্যা করার সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ এত তীব্র ছিল যে চলতি বসন্তে তারা এক অসাধারণ পদক্ষেপ নেয়। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়, ইসরায়েল তাঁদের হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আপনি যদি এই ব্যক্তিদের হত্যা করেন, তাহলে বাস্তববাদীদেরই হত্যা করবেন।’ ইসরায়েলের লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।

অপর এক কূটনীতিক জানান, মার্চ মাসেই যখন ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক পথ খুঁজতে শুরু করে, তখন থেকে মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁদের ইসরায়েলি সমকক্ষদের বলে আসছিলেন, যেন তারা ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যা করার অভিযান চালিয়ে না যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কর্মকর্তারা শুধু ইসরায়েলকে সতর্ক করেই থেমে থাকেননি, বরং ইরানকেও তাঁদের শীর্ষ আলোচকদের সম্ভাব্য হত্যার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইসরায়েলি সরকারের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের সীমিত প্রভাবকে স্পষ্ট করে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা এবং রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনের উপদেষ্টা অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘এটি দেখায় যে যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আলোচনাকে ভন্ডুল করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট চান শান্তিপ্রক্রিয়াটি এগিয়ে যাক।’

ইসরায়েলের সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসও প্রকাশ করেছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বহু রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাকে হত্যা করে। অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দেয়। যুদ্ধের শুরুতে দুই মিত্র দেশের লক্ষ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করেন, তেহরানের সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হবে। এরপরই দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে দ্রুত পার্থক্য তৈরি হয়।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোর শীর্ষ কর্মকর্তা আলী লারিজানিকে হত্যা করার পর সেই মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছিল সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনায় নয়, বরং লারিজানিকে হত্যার ঘটনায়। যুক্তরাষ্ট্র এমন একজন ইরানি কর্মকর্তার খোঁজ করছিল, যার সঙ্গে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি আর রইলেন না।’

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এপ্রিল মাসে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং জুনে যুদ্ধ শেষ করার একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আব্বাস আরাঘচি ও মোহাম্মদ গালিবাফই ছিলেন মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রধান যোগাযোগের ব্যক্তি। তবে ওই কাঠামোগত চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিস্টরা এর সমালোচনা শুরু করেন। কারণ, এই চুক্তি ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য কার্যত বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিনিময়ে দেশটিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা মুক্তির পথও খুলে দেয়।

মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইসরায়েলের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের অভিযান আলোচনার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জানেন, ব্যাপারটা একটু কঠিন। তারা সবাইকে মুছে ফেলেছে। আমি চাই না তাঁদের হত্যা করা হোক।’

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, যারা ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য উদ্ধৃত করেছে, জানিয়েছে যে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্য হওয়া একটি ভবনে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে গালিবাফও ছিলেন। এ ছাড়া দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চলতি বছরও একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকে ইসরায়েলের হামলায় গালিবাফ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

গালিবাফ, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যার চেষ্টার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে এমন একটি নির্মম শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকবে। আর সেটি এমন এক বয়স্ক নেতার স্থলাভিষিক্ত হবে, যাঁর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।


ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ