ইবাদতের পবিত্রতা এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতায় ঈদুল আযহা

নাঈমা সুলতানা

মতামত

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক পরম আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের এক অনন্য

2026-05-25T14:32:24+06:00
2026-05-25T14:32:24+06:00
শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইবাদতের পবিত্রতা এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতায় ঈদুল আযহা
নাঈমা সুলতানা
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ২:৩২ পিএম   (ভিজিট : ৯৪)

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক পরম আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের এক অনন্য মহিমান্বিত উৎসব। ইসলামে কোরবানির মূল দর্শন কেবল নির্দিষ্ট কোনো পশুর রক্ত ও মাংসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, ও সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দিয়ে তাকওয়া ও মানবিকতার লালনে। এই ধর্মীয় অনুভূতির অন্যতম প্রধান শর্তই হলো জনকল্যাণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা। তাই কোরবানির পবিত্রতার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার এক নাগরিক ও ঈমানী দায়িত্ব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজবাস্তবতায় ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বিশাল ও গতিশীল মৌসুমি অর্থনৈতিক চক্র। বিশেষ করে, কোরবানির পশুর চামড়া আমাদের দেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিবছর এই সময়ে দেশের সামগ্রিক চামড়া চাহিদার সিংহভাগ সংগৃহীত হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকার প্রধান উৎস। একসময় এই খাতকে 'লাল সোনা'র সঙ্গে তুলনা করে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক স্তম্ভ ভাবা হতো। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত কয়েক দশক ধরে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ঠিক পেছনেই জমে উঠছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্যের বহুমাত্রিক সংকট।

কোরবানির এই মহামূল্যবান কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের মূল গুরুভার বহন করে দেশের ট্যানারিগুলো। রাজধানী ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরের পেছনে মূল উদ্দেশ্যই ছিল বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো এবং পরিবেশ দূষণ দূর করা। কিন্তু সাভারের বর্তমান বাস্তবতায় সেই আশার আলো অনেকটাই ম্লান। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির অকার্যকারিতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশন এবং আধুনিক রাসায়নিক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার অভাব ধলেশ্বরী নদীসহ আশপাশের কৃষিজমি ও পরিবেশকে এক স্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থান পরিবর্তন হলেও দূষণের চরিত্র বদলায়নি- যা এই শিল্পের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।

চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত অতি মাত্রার ক্রোমিয়াম, সালফাইড, অ্যামোনিয়া এবং বিভিন্ন ভারী ধাতু পরিবেশের জন্য এক নীরব ঘাতক। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য যখন শোধন ছাড়াই মুক্ত জলাশয়ে বা নদীতে গিয়ে পড়ে, তখন তা জলজ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করে দেয়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, 'বায়ো-অ্যাকুমুলেশন' এর মাধ্যমে এই বিষাক্ত উপাদানগুলো খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। ফলস্বরূপ, আক্রান্ত এলাকার মানুষ দীর্ঘমেয়াদে চর্মরোগ, তীব্র শ্বাসকষ্ট, কিডনি বিকল হওয়া, এমনকি ক্যানসারের মতো মরণব্যাধীর মুখোমুখি হচ্ছে। অর্থনৈতিক মুনাফা যখন জনস্বাস্থ্যের এমন চড়া মূল্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সামগ্রিক উন্নয়নই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এর পাশাপাশি যোগ হয় ঈদের দিন ও পরবর্তী সময়ের তাৎক্ষণিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও চামড়া ছাড়ানোর অবশিষ্টাংশ অনেক সময়ই যত্রতত্র উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হয়। রোদ-বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে এগুলো দ্রুত পচতে শুরু করে, যা একদিকে যেমন বাতাসকে দুর্গন্ধময় করে তোলে, অন্যদিকে মশা, মাছি ও নানাবিধ রোগজীবাণুর বংশবৃদ্ধির উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বর্ষার মৌসুমে এই বর্জ্য যখন ধুয়ে ড্রেনে ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে, তখন মহানগরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা। এটি কেবল প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, আমাদের নাগরিক সচেতনতার অভাবকেও উন্মুক্ত করে দেয়।

তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো জ্বালানো সম্ভব, যদি আমরা সংকটের উৎসকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিবেশনীতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে বাংলাদেশের ট্যানারি খাতকে একটি পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিতে’ রূপান্তর করা অবাস্তব কিছু নয়।

প্রথমত, সাভারের সিইটিপি-কে শতভাগ কার্যকর ও আধুনিকায়ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন এক ফোঁটা অপরিশোধিত তরল বর্জ্যও নদীতে না মেশে, তা নিশ্চিত করতে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘গ্রিন ট্যানিং’ বা পরিবেশবান্ধব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তিতে দেশীয় শিল্পমালিকদের বিনিয়োগ বাড়াতে বাধ্য করতে হবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশনগুলোকে স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে, সমন্বিত ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। নির্ধারিত স্থানে কোরবানি দেওয়া, দ্রুততম সময়ে বর্জ্য সরণ এবং জীবাণুনাশক ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর মতো কাজগুলো নিখুঁতভাবে করতে হবে।

চতুর্থত, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে আগাম প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা দিতে হবে, যাতে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ পচে নষ্ট না হয়।

কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমাদের কেবল ত্যাগী হতেই শেখায় না, বরং সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতেও উদ্বুদ্ধ করে। যে উৎসবের মূল ভিত্তিই হলো আল্লাহভীতি ও তাকওয়া, সেখানে আমাদের অসচেতনতার কারণে সৃষ্ট বর্জ্য ও বিষাক্ত কেমিক্যাল যদি জনদুর্ভোগের কারণ হয় কিংবা প্রকৃতির বুক ক্ষতবিক্ষত করে, তবে তা হবে কোরবানির অন্তর্নিহিত দর্শনের সঙ্গে এক চরম বৈপরীত্য। পশুর চামড়া নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের এক বিপুল অর্থনৈতিক আশীর্বাদ, কিন্তু সেই আশীর্বাদ যেন আমাদের কর্মদোষে প্রকৃতির অভিশাপে পরিণত না হয়। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর পরিবেশ সংরক্ষণকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে, এদের মাঝে ইসলামের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের প্রতিফলন ঘটানো আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সরকার, শিল্পমালিক, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত অঙ্গীকারই পারে এই সম্ভাবনার খাতকে সংকটের হাত থেকে রক্ষা করতে। অন্যথায়, আজ আমরা যে অর্থনৈতিক মুনাফার হিসাব কষছি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি চড়া মূল্য দিতে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, 
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


ডেল্টা টাইমস্/নাঈমা সুলতানা/আইইউ









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ