ক্রীড়াঙ্গণে নতুন ভোরের সূর্যোদয়

মো. নূর আলম:

মতামত

বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখটি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা, অনিশ্চয়তা

2026-04-18T11:03:28+06:00
2026-04-18T11:03:28+06:00
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

ক্রীড়াঙ্গণে নতুন ভোরের সূর্যোদয়
মো. নূর আলম:
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০৩ এএম   (ভিজিট : ১৫)

বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখটি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা, অনিশ্চয়তা আর জীবন-জীবিকার কঠিন সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। "ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা"-এই সুদূরপ্রসারী স্লোগানকে ধারণ করে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার আজ বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ বেতন কাঠামো ও ক্রীড়া ভাতার উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ক্রীড়াবিদদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পেশাজীবীর মর্যাদা প্রদান করল, যা দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির খোলনলচে বদলে দেওয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গণে যে মেধাবী ও পরিশ্রমী অ্যাথলেটদের ভাণ্ডার রয়েছে, সঠিক পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে তারা এতদিন পূর্ণ বিকশিত হতে পারেনি। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জয়ের লড়াইয়ে আরও শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হবে। খেলাধুলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি যখন একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও তা অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের চোখের অনিশ্চয়তার ছাপ মুছে গিয়ে সেখানে এখন সোনালী আগামীর স্বপ্ন ঝিলিক দিচ্ছে।

ক্রীড়া ভাতা আসলে কী এবং কেন এটি প্রবর্তন করা হলো, সেই প্রশ্নটি অনেকের মনেই আসতে পারে। মূলত এটি কেবল একটি আর্থিক অনুদান নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের একাগ্রতা বজায় রাখার জন্য একটি স্থায়ী বেতন কাঠামো তৈরি করেছে। এই ভাতার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হয়ে আরও ভালো ফলাফল অর্জনে ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করা। যখন একজন খেলোয়াড় জানেন যে মাস শেষে তার নিকট একটি নির্দিষ্ট অংকের বেতন আসবে তখন তিনি মাঠের বাইরে জীবন-জীবিকার চিন্তায় মগ্ন না হয়ে মাঠের ভেতরে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এটি মূলত পেশাদারিত্বের একটি শক্তিশালী ভিত্তি।

কারা পাবেন এই ভাতা? এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে সকল ধরণের খেলার জাতীয় দলের সকল ক্রীড়াবিদদের। এর মধ্যে যেমন রয়েছেন জাতীয় দলের নিয়মিত মুখগুলো, তেমনি রয়েছেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্যারা ক্রীড়াবিদগণ। যারা শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন সরকার তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছে। এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা যেখানে প্রতিভার কদর করা হয়েছে শারীরিক সক্ষমতা বা ইভেন্টের জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বে উঠে। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন কোনো উদ্যোগ, যেখানে প্যারা অ্যাথলেটদের সমান মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো।

সময়সীমার কথা বলতে গেলে, এই যুগান্তকারী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ৩০ মার্চ ২০২৬ হলেও খেলোয়াড়রা এই ভাতা পেতে শুরু করবেন এপ্রিল ২০২৬ মাস হতে। প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট সময়ে খেলোয়াড়রা তাদের বেতন বুঝে পাবেন। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সোনালী ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটি-র মাধ্যমে সরাসরি খেলোয়াড়দের ব্যাংক হিসাবে এই টাকা পৌঁছে যাবে। এর ফলে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ থাকবে না।

ভাতার অংক এবং বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই বরাদ্দ নির্ধারণ করেছে। মোট ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে পর্যায়ক্রমে এই ভাতার আওতায় আনা হবে। প্রথম পর্যায়ে সুযোগ পেয়েছেন ১২৯ জন অ্যাথলেট। নির্বাচিত প্রত্যেক ক্রীড়াবিদ প্রতি মাসে বেতন হিসেবে পাবেন ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা। যারা বর্তমানে জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তারা এই এক লক্ষ টাকা মাসিক বেতনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়া পরিমণ্ডলে একটি অভাবনীয় উদাহরণ। এর পাশাপাশি প্রত্যেক জাতীয় ক্রীড়াবিদকে একটি করে বিশেষ 'ক্রীড়া কার্ড' প্রদান করা হবে, যা তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়িয়ে দেবে।

এই পুরস্কার ঘোষণা করার মূল কারণ হলো অ্যাথলেটদের মধ্যে বড়ো আসরে জয়ের ক্ষুধা তৈরি করা। যখন সাফল্যের সাথে সম্মানী ও সম্মানের গ্যারান্টি থাকে, তখন পরিশ্রমের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট ও ফুটবলের চাকচিক্যময় দুনিয়ার বাইরে অন্য সব ডিসিপ্লিনের অ্যাথলেটদের জীবন ছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে খেলার মাঠ ছেড়ে বেছে নিতে হয়েছে অন্য পেশা। কেউ হয়তো সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে অকালে অবসর নিয়েছেন, কেউ আবার পুষ্টি ও উন্নত প্রশিক্ষণের অভাবে ঝরে পড়েছেন মাঝপথেই। বিশেষ করে আর্চারি, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, ভারোত্তলন, উশু, কারাতে, টেবিল টেনিস ও কাবাডির মতো খেলায় যারা নিভৃতে দেশের হয়ে লড়াই করেন, তাদের জন্য এই এক লক্ষ টাকার বেতন একটি অভাবনীয় স্বপ্ন পূরণ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে অঙ্গীকার করেছিল, এটি সেই প্রতিশ্রুতিরই সফল বাস্তবায়ন।

এই বেতন কাঠামোর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ব্যবস্থা। সুবিধাটি পাওয়ার পর যেন অ্যাথলেটদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব তৈরি না হয়, সেজন্য প্রতি চার মাস পর পর তাদের পারফরম্যান্স কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হবে। যদি কোনো খেলোয়াড় তার খেলার মান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, তবেই তার এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু পারফরম্যান্সে ঘাটতি দেখা দিলে তাকে তালিকা থেকে বাদ পড়তে হবে এবং নতুন প্রতিভা সেখানে জায়গা করে নেবে। এই নিয়মটি ক্রীড়াঙ্গণে একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে, যেখানে সবাই নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে বাধ্য হবে।

ক্রীড়া কার্ডের সুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল টাকার কার্ড নয়। এই কার্ডধারীরা আন্তর্জাতিক মানের উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি তাদের জন্য থাকবে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, যা একজন অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে অত্যন্ত জরুরি। বিদেশি কোচের অধীনে প্রস্তুতি নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, এখন থেকে সরকার সরাসরি সেই অর্থায়ন নিশ্চিত করবে। এমনকি খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা যেন অথৈ জলে না পড়েন, সেজন্য পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

মাঠের লড়াইয়ে ঘাম ঝরানো খেলোয়াড়দের কণ্ঠেও আজ স্বস্তির সুর। টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা বা জাভেদ আহমেদদের মতো অ্যাথলেটরা যারা বছরের পর বছর পিছুটান নিয়ে খেলেছেন, তারা এখন খেলাকেই পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন। দেশের সাবেক দ্রুততম মানব মোহাম্মদ ইসমাইল যেমনটা বলছিলেন, একজন অ্যাথলেটের নিজের ফিটনেস ঠিক রাখা আর পুষ্টির চাহিদা মেটাতেই মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন সেই টাকা আর দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। আরচার হিমু বাছাড় কিংবা নারী ফুটবলের কাণ্ডারি সাবিনা খাতুনের মতে, এখন অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের খেলাধুলায় পাঠাতে আর দ্বিধা করবেন না। কারণ পেশা হিসেবে এর ভবিষ্যৎ এখন সুনিশ্চিত। বিশেষ করে প্যারা অ্যাথলেট শহীদ উল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই উদ্যোগটি কতটা মানবিক।

প্রথম ধাপে আর্চারি, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, ভারোত্তলন, উশু, প্যারা অ্যাথলেটিকস, কারাতে, সেপাক তাকরো, টেবিল টেনিস, কাবাডি, ভলিবল, বাস্কেটবল, ব্রিজ ও ফুটসালের ক্রীড়াবিদরা এই সুবিধার আলোয় আসছেন। এটি কেবল শুরু মাত্র। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খেলাকেও এই কাঠামোর অধীনে আনা হবে। যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একজন খেলোয়াড়কে এভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তা কেবল সেই ব্যক্তির জন্য নয়, বরং গোটা ক্রীড়া পরিবারের জন্য এক বড়ো অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। 

বর্তমান সরকারের এই আধুনিক পরিকল্পনা ক্রীড়াঙ্গণকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করল। "ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা"-স্লোগানটি এখন আর কেবল দেয়ালে লেখা কোনো শব্দ নয়, বরং এটি হাজারো খেলোয়াড়ের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই ঐতিহাসিক সূচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে, আমরা কেবল খেলার মাঠেই লড়ি না, আমরা আমাদের বীরদের সম্মান দিতেও জানি। সোনালী আগামীর যে স্বপ্ন আজ বুনে দেওয়া হলো তার ফল স্বরূপ অদূর ভবিষ্যতে অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের মতো বড়ো মঞ্চে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হবে; এটাই আজ সমগ্র দেশবাসীর প্রত্যাশা। ক্রীড়াঙ্গণের এই আমূল পরিবর্তন বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রীড়া মানচিত্রে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং তরুণ প্রজন্মকে মাঠের দিকে আরও বেশি টেনে আনবে। শুরু হলো এক নতুন যুগ।


লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর ঢাকা জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। পিআইডি ফিচার


ডেল্টা টাইমস/মো. নূর আলম/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ