টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য শক্তির বিকল্প নেই

প্রজ্ঞা দাস:

মতামত

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে।জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বর্তমান

2025-07-10T11:19:32+06:00
2025-07-10T11:19:32+06:00
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য শক্তির বিকল্প নেই
প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫, ১১:১৯ এএম   (ভিজিট : ২৭৪)
বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে।জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলো এমন শক্তির উৎস যা স্বল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় উৎপাদিত হয় এবং প্রাকৃতিকভাবে অবিরত পাওয়া যায়। এর মধ্যে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস এবং ভূ-তাপীয় শক্তি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করা আবশ্যক। কেননা আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, বড় কোনো নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ও বর্তমান হারে ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২০৩১–এর মধ্যেই আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে যাবে।

এছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যের অস্থিরতা, ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ভর্তুকি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। ফলে সরকার বারবার এবং বিপুলভাবে জ্বালানি গ্যাস, তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো আছেই।এমনিতেই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। ক্রমবর্ধমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানি‌ পোড়ানোর ফলে এ সংকট আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার মোট দেশজ উৎপাদনের ৭ শতাংশ হারাতে পারে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে উৎসাহী হওয়া উচিত। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সম্ভাবনা ব্যাপক।বিষুবরেখার সন্নিকটে হওয়ায় বাংলাদেশ প্রতিদিন ৪.০-৬.৫ কিলোওয়াট আওয়ার/বর্গমিটার সৌর বিকিরণ লাভ করে। অনুমান করা হয় যে এ শক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সর্বোচ্চ ২৪০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশের জাতীয় সৌরশক্তি রোডম্যাপে, ২০৪১ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে ৪০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের এসম্যাপ প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের সৌরসম্পদের ম্যাপ থেকে দেখা যায় যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে, উপকূলীয় দ্বীপসমূহ ও পার্বত্য এলাকায় সৌর বিকিরণ অধিক বিধায়, সেসব এলাকা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অধিকতর উপযোগী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তির বড় একটি সম্ভাবনার নাম বায়ুবিদ্যুৎ।দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ এ জন্য বিশেষ উপযোগী। বাংলাদেশে বায়ুর সর্বোচ্চ গতিবেগ ৭.৭৫ মিলি/সেকেন্ড, যা দিয়ে ৩০ গিগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, দেশের মোট জমির ৪ শতাংশ ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব।বাংলাদেশ যেহেতু নদী দ্বারা বেষ্টিত একটি অঞ্চল তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও বড় সুযোগ আছে। নদীর অবিচ্ছিন্ন ধারা ও জলপ্রপাত (রান অব দ্য রিভার) বা জলাধার সৃষ্টি—এই দুই প্রক্রিয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এছাড়া নবায়নযোগ্য জৈব শক্তির মাধ্যমে মানুষ অথবা পশু-পাখির বিষ্ঠা এবং পচনশীল আবর্জনা থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করা যায়। এই বায়োগ্যাসেরও রয়েছে পর্যাপ্ত ব্যবহার। রান্নার কাজে বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে ব্যবহৃত হয় এই বায়োগ্যাস। পাশাপাশি দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে সীমিত পরিমাণে ভূ-তাপীয় (জিও থার্মাল) জ্বালানি সম্ভাবনা আছে। ধারণা করা হয়, বায়োমাস থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটানো হয়ে থাকে। বায়োমাস ও বর্জ্য ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে।

তবে, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ শতাংশ।এটা খুবই হতাশাজনক।জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আর্থিক সাশ্রয়, জনস্বাস্থ্যের ওপর অনুকূল প্রভাব, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস প্রভৃতি সুবিধা রয়েছে। কেবল দুই গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি স্থাপন করা হলে বছরে জ্বালানি আমদানি বাবদ ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। এক জরিপে দেখা গেছে, সৌরশক্তির প্রসার ঘটলে এলএনজির চাহিদা ২৫ শতাংশ কমবে এবং এতে ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে পরিবেশ যেমন রক্ষা পাবে ,ঠিক তেমনি জীবাশ্ম জ্বালানির উপর চাপ কমবে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির পৃষ্ঠপোষক, ধারক ও বাহকদের থেকে মুক্ত হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই এটা করা অতীব জরুরী। এ লক্ষ্যে সরকার এবং আমাদের সকলের সামগ্রিকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।সেমিনার, কর্মশালা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপকারিতা গুলো সম্পর্কে সচেতন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সবুজ ও জলবায়ু সহিষ্ণুতাকে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।কয়লা ও এলএনজি আমদানি হ্রাস করতে হবে এবং এসব জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প থেকে সরে আসতে হবে।নবায়নযোগ্য শক্তি প্রসারে ইডকল, বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।জনগণকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নেট মিটারিং, ফিড-ইন-ট্যারিফ ও কার্বন ক্রেডিটের মতো প্রণোদনা দিতে হবে। সর্বোপরি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের একটি সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে এবং বছরওয়ারি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাগুলোর একটি বাস্তবভিত্তিক প্রাক্কলন দাঁড় করাতে হবে এবং তার ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা, গবেষণা ও সামাজিক আন্দোলন নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। তাদের উদ্যোগ আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ, সাধারণ জনগণের এবং তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির হাত ধরে আমরা একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে সক্ষম হব। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। এটা রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ