চীনের লক্ষ্য বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ: স্বল্পোন্নত দেশে ঋণের ফাঁদ কি তাহলে নতুন অস্ত্র?

প্রজ্ঞা দাস:

মতামত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব শাসনে পশ্চিমা প্রভাব যখন নৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করল, তখন

2025-06-22T13:04:35+06:00
2025-06-22T13:04:35+06:00
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

চীনের লক্ষ্য বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ: স্বল্পোন্নত দেশে ঋণের ফাঁদ কি তাহলে নতুন অস্ত্র?
প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: রোববার, ২২ জুন, ২০২৫, ১:০৪ পিএম   (ভিজিট : ৩২৯)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব শাসনে পশ্চিমা প্রভাব যখন নৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করল, তখন চীন ধীর অথচ সুদূরপ্রসারী এক কৌশলগত পথে পা বাড়াল। যার নাম “ঋণের ফাঁদ” । এই শব্দটি হয়তো কূটনৈতিকভাবে বিতর্কিত, কিন্তু অর্থনীতির নিরেট মাটিতে দাঁড়িয়ে এখন এটিই হয়ে উঠেছে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রমাণিত অস্ত্র। বিশেষ করে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বহু স্বল্পোন্নত দেশ আজ এই ঋণের ভারে নুয়ে পরছে।

চীনের আধিপত্যবাদী কৌশলের মূলমন্ত্র হলো ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI), যা ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্যিক সংযোগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করা। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগ পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ভূ-কৌশলগত অবস্থান দখল এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা সৃষ্টির এক নিখুঁত ষড়যন্ত্রে। চীন কোনো দেশকে সরাসরি রাজনৈতিক দখলে নিচ্ছে না বরং তারা নিচ্ছে তাদের বন্দর, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাদের সংযোগ অবকাঠামো। এই নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী যে, একবার ফাঁদে পরলে দেশগুলো আর সহজে বের হতে পারছে না। চীনের অর্থনীতি এখানে নিছক পুঁজি সরবরাহকারী নয়, বরং এক শ্রেণির দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যবাদী ব্যবসায়ী খেলোয়াড়।

বিশ্বজুড়ে শতাধিক দেশের সঙ্গে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)‌ এর অন্তর্ভুক্ত চুক্তি, প্রকল্প ও বিনিয়োগ এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এই উদ্যোগ শুধুই উন্নয়ন নয় বরং এটি এক একটি দেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা হ্রাসের সুপরিকল্পিত পথ। শ্রীলঙ্কা, জাম্বিয়া, কেনিয়া, লাওস, পাকিস্তানের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আজ আর বিচ্ছিন্ন গল্প নয়, এসব হলো ভবিষ্যতের মানচিত্র, যেখানে চীনের ঋণ মানেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সূচনা ক্ষেত্র ।যেখানে এক একটি দেশের সার্বভৌমতা মুছে যাচ্ছে "উন্নয়নের বিনিময়ে বন্ধক রাখার" নামে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইডড্যাটা’র তথ্য অনুসারে, চীন বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ৮৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৩,৪২৭টি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে।চীনের দেওয়া এই ঋণগুলো হয় সাধারণত ‘সহজ শর্তের’ ভান ও ‘উন্নয়ন সহযোগিতার’ মুখোশে ঢাকা আস্তরণে। কিন্তু চুক্তিগুলোর প্রকৃত শর্তগুলো থাকে অস্বচ্ছ, গোপন ও একচেটিয়াভাবে চীনা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। অর্থাৎ, চীন অর্থ দেয়, চীনের ঠিকাদার কাজ করে, এবং পরে সেই ঋণের সুদসহ অর্থ ফেরত দিতে হয় স্থানীয় জনগণকে। পরিণতিতে দেশটি হারায় অর্থনীতি, সম্পদ ও নীতিগত স্বাধীনতা। তাছাড়া চীনের ঋণের শর্তগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেই দিকের বিবেচনায় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার মত একটি ঋণের ফাঁদ । ঋণ পরিশোধে অক্ষম হওয়ায় শ্রীলঙ্কা এই বন্দরের ৭০ শতাংশ ৯৯ বছরের জন্য চীনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। তাছাড়াও আফ্রিকার অনেক দেশ এখন জাতিসংঘে চীনের প্রস্তাবে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে, কারণ তারা চীনের ঋণে জর্জরিত। লাওসের বিদ্যুৎ খাত এখন পুরোপুরি চীনা নিয়ন্ত্রণে।পাকিস্তানের সিপিইসি (CPEC) প্রকল্প চীনের সামরিক আগ্রাসনের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সব দেশ আজ চীনের ঋণের বোঝায় শুধু অর্থনীতিকেই হারায়নি, হারিয়েছে আন্তর্জাতিক অবস্থান, কূটনৈতিক স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বলিষ্ঠতা। 

বাংলাদেশও চীনের এই কৌশলের বাইরে নয়।পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, ঘুনধুম রেল প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও ঠিকাদারি কাজের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। চীনের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান করছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে চীনের ঋণের পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে। ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার পাঁচটি প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন বাতিল করেছে, যা চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের বিপরীতমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তবুও, চীনের অর্থায়নের উপর বাংলাদেশের নির্ভরতা এবং ঋণের ফাঁদে পরার ঝুঁকি এখনও কাটেনি। 

একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চীনের এই ঋণের ফাঁদ সম্পর্কে বহিঃবিশ্ব এবং এর শক্তিশালী দেশগুলো অতটা গুরুত্ব না দিলেও বর্তমান সময়ে চীনের এই আগ্রাসী ঋণ কৌশল নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। IMF, G7 এবং বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যেই অনেক দেশের ঋণ পুনঃগঠন করতে বাধ্য হয়েছে চীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে। তবে চীন একে "ঋণ সহানুভূতি" হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেদের এই আগ্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। চীন বারবার বিভিন্নভাবে প্রমাণ করতে চাচ্ছে, যেন তারা মানবিক উন্নয়নের অংশীদার। বাস্তবে, এটি একপ্রকার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল যা চীনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সাধন করতে সহায়তা করবে।চীনের ঋণকূটনীতি আজ অর্থনৈতিক অঙ্কের বাইরেও এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সত্য। এই ঋণ হচ্ছে একেকটি দেশকে অর্থনৈতিক নির্ভরতা আর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নমনীয়তার পথে ঠেলে দেওয়ার অদৃশ্য মারণাস্ত্র।

ঋণ পরিশোধে অক্ষম দেশগুলোকে প্রাথমিকভাবে কৌশলগত অবকাঠামো ছাড়তে হচ্ছে, পরবর্তী ধাপে ছাড়তে হচ্ছে নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা।বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন এই কৌশলের ছায়া স্পষ্ট লক্ষণীয়। তাই এখনই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশকেও শ্রীলংকা, পাকিস্তান কিংবা আফ্রিকান দেশগুলোর মত চীনের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে। যা কখনোই বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয় এবং তা হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক পরাধীনতা কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি এক জাতির আত্মমর্যাদার গভীরে ক্ষত সৃষ্টিকারী আঘাত। যার মাধ্যমে স্বাধীনতা হারায় প্রথমে নীতিতে, পরে অর্থনীতিতে, আর সবশেষে আত্মপরিচয়ে। আজকের চীন যে পদ্ধতিতে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে,সেখানে অর্থই অস্ত্র, বন্ধুত্বই ফাঁদ, এবং উন্নয়নই নিয়ন্ত্রণের রাস্তাঘাট। এমন উন্নয়ন দেশে কম হোক তবুও স্বতন্ত্রতা , সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতা রক্ষিত হোক। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার পূর্বে কোন সত্য থাকতে পারে না। 


লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ