বাৎসরিক নাটকে প্রতিবারই শিক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি ছাত্রসমাজ

প্রজ্ঞা দাস:

মতামত

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। প্রতিটি সভ্য সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষার ভিত্তিতে। অথচ বাংলাদেশে করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা এক

2025-06-15T10:52:01+06:00
2025-06-15T11:01:05+06:00
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

বাৎসরিক নাটকে প্রতিবারই শিক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি ছাত্রসমাজ
শর্ট সিলেবাস ও বিলম্বিত পরীক্ষার দাবি
প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: রোববার, ১৫ জুন, ২০২৫, ১০:৫২ এএম  আপডেট: ১৫.০৬.২০২৫ ১১:০১ এএম  (ভিজিট : ২৯১)

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। প্রতিটি সভ্য সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষার ভিত্তিতে। অথচ বাংলাদেশে করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা এক উল্টো বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি—যেখানে ছাত্রসমাজ নিজেরাই, কখনো সচেতনভাবে, কখনো অনিচ্ছায়, সেই ভবিষ্যতের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে তুলছে।


প্রতি বছর ‘শর্ট সিলেবাস’ ও ‘পরীক্ষা বিলম্ব’-এর দাবিকে কেন্দ্র করে যে ধারাবাহিক আন্দোলন হয়, তা শিক্ষার্থীদের এক সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।


এই দাবিগুলোর পেছনে তাৎক্ষণিক সুবিধার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, এর গভীর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মান ও গভীরতায়। এতে করে একটি প্রজন্ম বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল হয়ে উঠছে।


শর্ট সিলেবাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করতে শুরু করছে যে, পরীক্ষায় পাস করতে ন্যূনতম প্রস্তুতিই যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তব জীবনে পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচি প্রয়োজন—যা যুক্তিবাদী চিন্তা, বিশ্লেষণক্ষমতা ও সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের দক্ষতা তৈরি করে।


📌 ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় আন্দোলনের চাপে প্রায় ৩০% সিলেবাস বাদ দেওয়া হয়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ৬৫% শিক্ষার্থী মনে করেন তাঁদের মৌলিক ধারণাগুলো দুর্বল—যা শর্ট সিলেবাসের একটি সরাসরি পরিণতি।


📌 ২০২১ সালের মহামারিকালীন সময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা বিলম্বের ফলে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ক্যালেন্ডারের বিশৃঙ্খলায় পড়ে যায়। অনেকেই এক বছর শিক্ষাজীবন হারায়।


এমন মানসিকতা ভবিষ্যতে তৈরি করে এমন কর্মশক্তি, যারা দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, সময়মতো কাজ শেষ করতে পারে না এবং চাপের মুখে ভেঙে পড়ে।


এই আন্দোলনগুলোর পেছনে প্রায়শই থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির সুপরিকল্পিত প্রয়াস।


শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে রাজপথে নামানো হয় এবং ভুল ধারণা গড়ে তোলা হয়—আন্দোলনেই সব সমস্যার সমাধান। অথচ বাস্তবে, এই চক্র শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করে এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক অনন্ত সংকটে ফেলছে।


এই সংকটচক্রটি এভাবে কাজ করে—


১. শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে।
২. প্রশাসন চাপে পড়ে দাবি মেনে নেয়।
৩. শিক্ষার মান কমে যায়।
৪. শিক্ষার্থীরা আরও দাবি তোলে।
৫. শিক্ষক হতাশ, অভিভাবক উদ্বিগ্ন।
৬. সমাজে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি দেখা দেয়।


এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য চাই:


শর্ট সিলেবাস ও বিলম্বিত পরীক্ষার সংস্কৃতি বাতিল।

সময়মতো পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করার উদ্যোগ।

শিক্ষকদের সংখ্যা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও কঠোর পরিশ্রমের চর্চা।

অভিভাবকদের সচেতন ও সহায়ক ভূমিকা।


📢 সফলতার কোনো শর্টকাট পথ নেই।


শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে এই বাৎসরিক নাটকের অবসান ঘটাতে হবে। শিক্ষা শর্টকাটের জন্য নয়, এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে গঠিত কাঠামো।


‘শর্ট সিলেবাস’ ও ‘বিলম্বিত পরীক্ষা’র দাবিগুলো সেই কাঠামোকে প্রতিনিয়ত ভেঙে দিচ্ছে। জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য চাই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান, সময়মতো শিক্ষা সমাপ্তি, এবং সুশৃঙ্খল পাঠ্যপদ্ধতি।


তবেই বাংলাদেশ গড়ে উঠবে আত্মনির্ভর, দক্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি হিসেবে, এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে নিজেদের সম্মানজনক স্থান করে নিতে পারবে।



লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।


ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ