
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একদিন জ্ঞানের আলো ছড়ানোর পবিত্র আঙিনা ছিল। এখানে তরুণরা তাদের স্বপ্নের ভিত গড়ত, ভবিষ্যত বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের নেতৃত্ব তৈরির প্রস্তুতি নিত। কিন্তু আজ সেই ক্যাম্পাসগুলো নিরাপত্তাহীনতার ছায়ায় ঢেকে গেছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন শিক্ষার্থী বহিরাগতের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। এর কিছুদিন আগে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তাঁর নিজ ক্যাম্পাসে একইভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো কেবল দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েট এমনকি ছোট ছোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছিনতাই, হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সভ্যতা গঠনের কারখানা। এখানে যারা আসে, তারা কেবল ছাত্র বা ছাত্রী নয়, তারা ভবিষ্যতের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ , রাজনীতিবিদ, বিচারক, সাংবাদিক, শিল্পী ও কবি। তারা কেবল ডিগ্রি অর্জন করতে আসে না, তারা আসে বিকশিত হতে, মানবিক হতে, সমাজকে দেখার চোখ তৈরি করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের শিক্ষার ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠান দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একজন শিক্ষার্থীর ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনা আমাদের সামনে একটি মর্মান্তিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে।এই ঘটনা প্রথম নয়। মাত্র কিছুদিন আগেই রাজধানীর প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী নিজের ক্যাম্পাসেই বহিরাগত সন্ত্রাসীর হাতে নিহত হয়েছিল। একই শহরে, একই বয়সের তরুণ, একইরকম স্বপ্ন আর একইরকম নির্মম পরিণতি। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ৩০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার সিংহভাগের পেছনে রয়েছে বহিরাগত কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবিত গোষ্ঠী। এসব ঘটনার বেশিরভাগেই কোনো দৃশ্যমান বিচার হয়নি। মামলা হয়েছে, চার্জশিট জমা পড়েছে, মিডিয়ায় কিছুদিন সরব থেকেছে; তারপর হারিয়ে গেছে।বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কেবল অপরাধীদের নয়, পুরো সমাজকে শিক্ষার্থীদের উপর অন্যায় করতে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু এবং একটি সমাজের ব্যর্থতার চিত্র।
বারবার ছাত্ররা কেঁদেছে, আন্দোলন করেছে, প্রশাসনের টেবিলে গেছে চিঠি, মিছিলের গলায় উঠেছে দাবি। তবু বদলায়নি বাস্তবতা। আজ এই নির্মম অপমৃত্যুগুলো শুধু একটি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাহীনতার নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রশ্ন নিরাপত্তার, প্রশ্ন নৈতিকতার, প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের।
মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত, সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণ রয়েছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় ক্যাম্পাসে একাধিক প্রবেশপথ এবং বিস্তৃত এলাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে। বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে অবাধে প্রবেশ করে ছিনতাই, হয়রানি, এমনকি হত্যার মতো অপরাধমূলক কার্যকলাপ করছেন । প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যেখানে ক্যাম্পাসের আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট, সেখানেও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অভাবে বহিরাগতরা সহজেই প্রবেশ করছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার অভাব, অপ্রতুল নিরাপত্তা কর্মী এবং দুর্বল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ক্যাম্পাসকে অপরাধের জন্য উপযুক্ত করে দিয়েছে।
এর সাথে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্র রাজনীতির অপব্যবহার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি প্রায়ই সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, হল দখল এবং ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের উপর নিপীড়নের ঘটনা নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে তুলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি কম হলেও, প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি আরো রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা।
একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি আমাদের সমগ্র জাতির ক্ষতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত শিক্ষার্থীর মা যখন কান্নায় ভেঙে পরেন, তখন তাঁর কান্না আমাদের সকলের। প্রাইম এশিয়ার সেই শিক্ষার্থী, যিনি তাঁর ক্যাম্পাসে নিহত হন, তাঁর মৃত্যু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।ক্যাম্পাস, যেটি হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানের পবিত্র আঙিনা, সেটি রক্তাক্ত ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে বারংবার।এই ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি আমাদের সমাজের, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার, এবং আমাদের দেশের ভবিষ্যতের ক্ষতি।
এই পেক্ষাপটে নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে আমাদের একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত, যুক্তিযুক্ত এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গির। ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশপথ, রাস্তা এবং স্পর্শকাতর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীদের জন্য কোনো অন্ধকার কোণা না থাকে।পেশাদার নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ ও তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারেও দক্ষ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য স্মার্ট আইডি কার্ড সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণমুখী করতে হবে। রাজনৈতিক দলের প্রভাব কমিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোকে শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে মনোযোগী করতে হবে।সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান প্রয়োগ করতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। ক্যাম্পাসে অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
নিরাপদ ক্যাম্পাস আমাদের শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার এবং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের পূর্বশর্ত।দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি তরুণদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াবে। শিক্ষার এই নিরাপদ পরিবেশ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করবে, যারা জাতিকে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যাবে। নিরাপত্তা ও শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি উজ্জ্বল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই