পথশিশুর চোখেও থাক ঈদের খুশি

জোলেখা আক্তার জিনিয়া:

মতামত

ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ভালোবাসা, আনন্দ, পারস্পরিক সহমর্মিতা

2025-03-31T10:32:12+06:00
2025-03-31T10:32:12+06:00
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

পথশিশুর চোখেও থাক ঈদের খুশি
জোলেখা আক্তার জিনিয়া:
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ, ২০২৫, ১০:৩২ এএম   (ভিজিট : ৫৫৫)
ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ভালোবাসা, আনন্দ, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবিকতার প্রতীক। ঈদ মানেই নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, এবং একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দ সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না।

সাধারণত আমরা ঈদকে উপলক্ষ করে নিজেদের জন্য নতুন পোশাক কিনি, সুস্বাদু খাবার তৈরি করি এবং আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাই। কিন্তু আমাদের আশপাশেই এমন অসংখ্য শিশু রয়েছে, যাদের কাছে ঈদ শুধুমাত্র আরেকটি সাধারণ দিন। তারা নতুন জামা, ভালো খাবার বা পরিবারের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত থাকে। বিশেষ করে পথশিশুরা, যারা আমাদের শহরের অলিগলিতে, রেলস্টেশনে, বাস টার্মিনালে কিংবা ফুটপাতে বসবাস করে—তাদের জন্য ঈদ মানেই বঞ্চনা আর দুঃখের আরেকটি নাম।
পথশিশুদের ঈদ: আনন্দ না বেদনা?

আমরা যখন নতুন জামা পরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি, তখন অনেক পথশিশু হয়তো পুরনো ছেঁড়া কাপড়ে ঈদের দিনটিও পার করে। আমরা যখন সুস্বাদু খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত থাকি, তখন তারা হয়তো শুকনো রুটির টুকরো জোগাড় করতেই হিমশিম খায়।

শহরের ঝলমলে শপিং মল, রঙিন আলোকসজ্জা, নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষ—এসব দেখে পথশিশুরা হয়তো ভাবে, "এই আনন্দ কি আমার জন্য নয়?" একদিকে খাবারের টেবিল সাজানো থাকে সুস্বাদু খাবারে, অন্যদিকে কিছু শিশু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এই নির্মম বৈষম্য কি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয় না?

ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তা সবার মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। শুধু নিজের পরিবারের মানুষদের জন্য নয়, আমাদের আশেপাশের অসহায়, দুঃস্থ ও পথশিশুদের দিকেও আমাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

পথশিশুদের বাস্তবতা: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র

বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ পথশিশু রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে বাস করে। এই শিশুদের বেশিরভাগই পরিবারহীন, অথবা তারা এমন পরিবার থেকে এসেছে যেখানে দারিদ্র্য, সহিংসতা ও অবহেলা নিত্যদিনের সঙ্গী।

পথশিশুদের বেশিরভাগই কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায় না। তাদের অনেকে ছোটখাটো কাজ করে, যেমন—টোকাই হিসেবে আবর্জনার মধ্যে থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু সংগ্রহ করা, রাস্তায় ফুল বা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা, কিংবা হোটেলে কাজ করা। কিছু পথশিশু অপরাধী চক্রের হাতে পড়ে মাদক বহন, পকেটমারি কিংবা চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

এই শিশুদের জীবনে ঈদ মানেই আরেকটি দিন, যেখানে তাদের একই রকম সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। যখন সমাজের একটা অংশ ঈদের নতুন পোশাক, দামি খাবার আর বিনোদনে মেতে ওঠে, তখন এই শিশুরা হয়তো একটা শুকনো রুটি বা একটুখানি ভালোবাসার অপেক্ষায় দিন কাটায়।
আমরা কী করতে পারি?

আমাদের সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন রয়েছে, যারা পথশিশুদের জন্য কাজ করছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবেও আমরা অনেক কিছু করতে পারি, যেমন—

    নতুন পোশাক দেওয়া: আমরা আমাদের পরিবারের জন্য যেভাবে ঈদের শপিং করি, তেমনই যদি পথশিশুদের জন্যও কিছু নতুন পোশাক কিনে দিই, তাহলে তাদের জন্য ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও বেড়ে যাবে।

    ভালো খাবারের ব্যবস্থা: আমাদের বাড়িতে ঈদের দিনে যে অতিরিক্ত খাবার তৈরি হয়, তার একটি অংশ যদি অসহায় শিশুদের মাঝে বিতরণ করা যায়, তাহলে অনেক শিশু ঈদের প্রকৃত স্বাদ পেতে পারে।

    শিক্ষার ব্যবস্থা: পথশিশুদের জন্য ঈদের খুশি শুধু এক দিনের আনন্দে সীমাবদ্ধ না রেখে, যদি আমরা তাদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে চিন্তা করি, তবে তাদের ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

    ভালোবাসা ও মানবিক আচরণ: পথশিশুরা সমাজেরই অংশ। তাদের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে না তাকিয়ে, একটু ভালোবাসা ও মানবিক আচরণ করলে তাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসতে পারে।

ঈদের প্রকৃত শিক্ষা: সহমর্মিতা ও সাম্য

ঈদ কেবল তাদের জন্য নয়, যাদের হাতে নতুন পোশাক, দামি উপহার বা সুস্বাদু খাবার থাকে। বরং ঈদ তাদের জন্যও, যারা বছরের পর বছর কষ্ট, অবহেলা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

ঈদ আমাদের শেখায়, প্রকৃত আনন্দ তখনই আসে, যখন সেটি সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যায়। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ যদি একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ঈদের আনন্দ সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।

আসুন, ঈদকে সবার জন্য আনন্দময় করি

আমরা যদি পথশিশুদের জন্য সামান্য সহযোগিতার হাত বাড়াই, তাহলে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারব। তাদের জন্য ঈদ শুধু একটি দিনের উৎসব নয়, বরং এটি আমাদের মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরীক্ষাও।

এই ঈদ হোক সত্যিকারের সবার জন্য—বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা আমাদের আশপাশে থেকেও প্রায়শই অদৃশ্য হয়ে থাকে। যদি আমরা পথশিশুদের সহানুভূতির অংশ করে তুলতে পারি, তবে ঈদের আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।

ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা তাদের মুখে হাসি ফুটাতে পারব, যারা বছরের পর বছর দারিদ্র্য, অবহেলা আর কষ্টের মধ্যে দিন কাটায়। আসুন, ঈদকে শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, বরং সকলের জন্য আনন্দের উৎসবে পরিণত করি। তাহলেই ঈদ হবে সত্যিকার অর্থে হৃদয়স্পর্শী, মানবিক ও সমতার প্রতীক।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, এবং সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে, পথশিশুদের ঈদের খুশিতে সামিল করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।


লেখক : অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

ডেল্টা টাইমস/জোলেখা আক্তার জিনিয়া/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ