ধর্ষণের আইন ও শাস্তি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ কী

প্রজ্ঞা দাস:

মতামত

বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা বর্তমানে একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র

2025-02-20T11:50:51+06:00
2025-02-20T11:59:12+06:00
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

ধর্ষণের আইন ও শাস্তি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ কী
প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১১:৫০ এএম  আপডেট: ২০.০২.২০২৫ ১১:৫৯ এএম  (ভিজিট : ৪৩২৭)
বাংলাদেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা বর্তমানে একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৯ ঘণ্টায় একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। যদিও ধর্ষণের শাস্তি নিশ্চিত করতে কঠোর আইন রয়েছে, বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু দোষীদের শাস্তি হচ্ছে না বা তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে, ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে ২০২০ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনগত শাস্তি শাস্তিযোগ্য হলেও সহিংসতা কমছে না। বরং একের পর এক নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১,৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৭৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, এবং ১০ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ধর্ষণের অভিযোগে ১,৫২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আরও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারিতে ১১২টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

ধর্ষণের এই ভয়াল থাবা থেকে শিশু, বৃদ্ধ, যুবতী—কেউই রক্ষা পাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, বিচারকার্যে বিলম্ব, ক্ষমতাশীলদের দৌরাত্ম্য, মাদকের ব্যাপক ব্যবহার এবং সহজলভ্যতা উল্লেখ করা যায়।

দেশের ৯৫টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রায় পৌনে দুই লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার মামলা ৫ বছরের বেশি পুরোনো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রত্যেকটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রায় ১,৭৫০টি মামলার জট রয়েছে, যার ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্ষণের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা প্রায়ই সম্ভব হয় না। ফলে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ৩-৪%। অর্থাৎ ৯৬-৯৭% অপরাধী শাস্তির বাইরে থেকে যায়, যা ধর্ষণের হার বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

প্রভাবশালীদের অন্যায় হস্তক্ষেপও ধর্ষণকারীদের আরও উৎসাহিত করে। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ধর্ষকদের আইনের শাস্তি থেকে বাঁচাতে তাদের ক্ষমতা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেন। আমাদের দেশের আইনে সাক্ষীর সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান নেই, যার ফলে অনেক ভুক্তভোগী নিরাপত্তার অভাবে মামলা করতে সাহস পান না। তাদের পরিবারও হুমকির মুখে পড়ে।  

এছাড়া, ধর্ষণের মামলায় যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে, ফলে আদালতে প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যায়। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ধর্ষণই পরিচিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হয়, এবং অনেক সার্ভাইভর সামাজিক ও পারিপারিক চাপের কারণে মামলা করেন না। এতে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না, এবং ধর্ষণের পরপরই গোসল করলে প্রমাণ হারিয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধর্ষণের ঘটনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ প্রতিরোধে রাষ্ট্রসহ সকলের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।  
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।


ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ