পাবনার বিখ্যাত ঘি জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সময়ের দাবি

অলোক আচার্য:

মতামত

আমাদের দেশে এক একটি এলাকা একেকটি বিশেষ পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এসবের সুনাম পৌছে যায় দেশের গন্ডি

2024-02-17T10:11:55+06:00
2024-02-17T10:11:55+06:00
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

পাবনার বিখ্যাত ঘি জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সময়ের দাবি
অলোক আচার্য:
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১০:১১ এএম   (ভিজিট : ২০২৪)
আমাদের দেশে এক একটি এলাকা একেকটি বিশেষ পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এসবের সুনাম পৌছে যায় দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে। প্রাচীনকাল থেকেই এটা হচ্ছে। কোনো একটি পণ্য বিখ্যাত হয় সেই অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান, মাটির গুনাগুণ এবং দক্ষ মানুষের হাতের ছোঁয়ায়। এসব পণ্য যদি ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তাহলে সেই পণ্যটি সেই নির্দিষ্ট এলাকার হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়। কোনো একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া এবং ওই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাহলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ সেই পণ্য শুধু ওই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এলাকার মতো উৎপাদন করা কষ্টসাধ্য। জিআই (এও) এর পূর্ণরুপ হলো (Geographical indication)  ভৌগলিক নির্দেশক। WIPO (world intellectual property organization) হলো  জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দানকারী প্রতিষ্ঠান।  

নতুন তিন পণ্যের জিআই স্বীকৃতি দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আরও তিনটি পণ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে অনুমোদন দিয়ে জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। পণ্য তিনটি হলো- যশোরের খেজুর গুড়, রাজশাহীর মিষ্টি পান এবং জামালপুরের নকশিকাঁথা। এ নিয়ে বাংলাদেশে অনুমোদিত জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩১টি। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩ পাস হয়। এর দুই বছর পর ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৬ সালে জামদানি শাড়িকে বাংলাদেশে প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর স্বীকৃতি পায় আরও ২০টি পণ্য। সেগুলো হলো- বাংলাদেশের ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, বিজয়পুরের সাদা মাটি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, বাংলাদেশের কালিজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহী সিল্ক, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, বাংলাদেশের শীতল পাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলশীমালা ধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, বাংলাদেশের ব্ল্্যাক বেঙ্গল ছাগল, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই ও কুষ্টিয়ার তিলের খাজা। সম্প্রতি অনুমোদিত তিনটি পণ্য হলো- টাঙ্গাইল শাড়ি, নরসিংদীর অমৃতসাগর কলা ও গোপালগঞ্জের রসগোল্লা।
 
২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিআই পণ্য সর্বমোট ১০টি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিছুদিন ধরেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বা হচ্ছে টাঙ্গাইলের শাড়ী নিয়ে। দেশের জেলার মধ্যে পাবনা জেলারও কয়েকটি নিজস্ব পণ্য রয়েছে এবং এসব পণ্য জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী রাখে। এখন যেহেতু জিআই পণ্য স্বীকৃতির কাজটি আরও দ্রুততর হয়েছে সেহেতু আশা করা যায় এ অঞ্চলের পণ্যেরও স্বীকৃতি মিলবে। পাবনার মুখে মুখে আলোচিত বিখ্যাত পণ্যটির নাম হলো ঘি। কারণ এ অঞ্চলে প্রচুর দুধ উৎপাদিত হয় এবং এখান থেকে দেশের বিভিন্ন কোম্পাণির প্যাকেটজাত দুধের একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হয়। এবং এখানেই ঘি উৎপাদন করা হয় সবচেয়ে বেশি এবং সারাদেশে এর সরবরাহ করা হয়। যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে নারী-পুরুষসহ অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। ঘি নিয়ে একটি প্রবাদ এ অঞ্চলসহ সারাদেশেই প্রচলিত আছে। পদ্মার ইলিশ আর পাবনার ঘি/ জামাইয়ের পাতে দিলে আর লাগে কি?’ এ অঞ্চলে পদ্মার ইলিশ আর খাঁটি গাওয়া ঘি এই দুই-ই আছে। সুতরাং জামাই সন্তুষ্টি ভালোভাবেই হয়। পাবনার ঘিয়ের সুনাম দেশের বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, বিদেশেও পাবনার ঘিয়ের কদর ছড়িয়েছে। ঘি নিয়ে তাই পাবনা বাসী গর্ব করতেই পারে। কিন্তু এখন জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী। পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া,আটঘরিয়া,ফরিদপুর এবং বেড়া উপজেলার সাথে লাগোয়া সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর অঞ্চলে প্রচুর দুধ উৎপাদন করা হয়। এই দুধের কারণেই প্রচুর ঘিও উৎপাদন করা হয়। পাবনার দুধ উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে রয়েছে প্রচুর ছানা তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় ছানা তৈরির পাশাপাশি ননিও তৈরি হয়। আবার অনেক খামারি নিজেদের খামারে উৎপাদিত দুধ কোনো কারণে বিক্রি করতে না পারলে তা থেকে ননি তৈরি করে থাকেন। এ ছাড়া এলাকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোও দুধের উদ্বৃত্ত ননি তুলে রাখে।

ফলে পাবনার দুধ উৎপাদনকারী এলাকায় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় পর্যাপ্ত ননি। ঘি তৈরির কারিগরেরা সেই ননি সংগ্রহ করে জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন ঘি। সাধারণত দুই কেজি ননি জ্বাল দিয়ে এক কেজি ঘি পাওয়া যায়। আবার আসি পাবনার ঘি এর  সুনামের কথায়।  ব্রিটিশ আমল থেকেই পাবনা ঘি এর জন্য বিখ্যাত । অর্থাৎ পাবনার ঘি মুখে তুলেছেন ব্রিটিশরাও। তৎকালীন জমিদারদের কাছে এই ঘি ছিল নিজের ব্যবহার এবং উপহার হিসেবে। তার মানে এই ঘি শুধু বাংলায় নয়, পুরো ভারতবর্ষেই এটি সমান জনপ্রিয় ছিলো। ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধী পাবনার ঘি এর ভক্ত ছিলো। বাংলার কংগ্রেস নেতারা তাঁর জন্য নিয়মিত এখানকার ঘি উপহার পাঠাতো বলে একটি কথা প্রচলিত আছে সেখানে। পাবনার ঘি ওই জনপদের শুধু ঐতিহ্য নয়, এটি এখন একটি শিল্প। শত বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে এখন বাণিজ্যিকভাবে ঘি সহ বিভিন্ন রকম মিষ্টি তৈরি হচ্ছে সেখানে। একটি পণ্য তখনই শিল্পে পরিণত হয় যখন সেই পণ্য কেন্দ্র করে বহু বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের তৃপ্তি ও কাজের ঠিকানা। পাবনার বিখ্যাত ঘি যার সুনাম ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে ছড়িয়েছে সেই পণ্যটির সাথে এই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা জড়িয়ে রয়েছে। এই পণ্যটি এখন সময়ের সাথে সাথে ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবিদার।



লেখক : শিক্ষক  ও কলামিস্ট, পাবনা।

ডেল্টা টাইমস/অলোক আচার/সিআর/এমই 









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ