বৃহস্পতিবার ২০ জানুয়ারি ২০২২ ৫ মাঘ ১৪২৮

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিন
রাশেদুজ্জামান রাশেদ
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২১, ৬:২৬ পিএম আপডেট: ২৯.১১.২০২১ ৬:৩১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ধর্ষণের খবর নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন পত্রিকায় পাতায় পাতায় ধর্ষণ, নির্যাতন ও খুনের খবর ছাপানো হয়। তবুও রাষ্ট্রযন্ত্র কেন জানি নিরব ভূমিকা পালন করে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তার ফল গোটা দেশের মানুষ ভোগ করতেছে। পুঁজিবাদ কতটা নিষ্ঠুর হলে নারীকে ভোগপণ্যে পরিণত করতে পারে তা আমাদের দেশের মা ও বোনের চোখের কান্নায় প্রমাণিত। এর সমাধানের পথ কী নেই? সম্প্রতি আমাদের দেশে গণপরিবহনে বাসের হেল্পার রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। ঘটনাটি সারাদেশে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরী হলে ওই বাসের হেল্পারকে পুলিশ গ্রেফতার করছে।  

প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও কলকারখানা নারী শ্রমিক গণপরিবহনের যাতাযাত করে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। সরকার ও পরিবহন মালিক নাটক করে জনগণকে জিম্মি করে জ্বালানি দাম লিটারে ১৫ টাকা, বাসে ২৭% ও লঞ্চে ৩৫% ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্র ও মালিকের আঁতাতে সাধারণ জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে দিনের পর দিন প্রতিবাদ করার কেউ নেই। কোনো এক ব্যক্তি চায়ের দোকানে বসে অন্য এক ব্যক্তিকে বলে, জ্বালানি তেলে দাম বৃদ্ধি হয়েছে এতে তার না কি কোনো সমস্যা নাই কারণ তিনি জ্বালানি তেল ব্যবহার করেন না। তার এককেন্দ্রিক চিন্তা দেখে মনে পড়ে ছোটবেলার রুপলাল গল্পের কথা। ওই গল্পে আমাদের শিক্ষা দিয়েছে কোনো মানুষ একক ভাবে বসবাস করতে পারে না। তাকে বসবাস করতে হলে সমাজেই বসবাস করতে হবে। কারণ সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ঠিক তেমনি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে গণপরিবহন ভাড়া ও কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে কিন্তু মানুষের তো আয়ের উৎস বাড়েনি। দেশে কর্মহীন অথবা বেকার মানুষের জন্য তো নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরী হয় নি। তাহলে মূল্যবৃদ্ধি এই লাগাম টানবে কীভাবে? আমাদের মৌলিক অধিকার গুলো রাষ্ট্র আমাদের ভুলিয়ে রাখতে চায় কেন? কৃষক উৎপাদন করে ১৬ কোটি মানুষের মুখের অন্ন জোগান দেয়, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠায়, কল-কারখানার শ্রমিক পোশাক উৎপাদন করে দেশের সর্বোচ্চ আয় করে, শিক্ষকরা অন্ধকার সমাজ কে আলোর সমাজ নির্মাণ করে মানবসম্পদে পরিণত করে ও চিকিৎসকরা মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয় কিন্তু প্রশ্ন আমাদের যারাই ক্ষমতায় আসে তাদের নেতাকর্মীদের কাজ কী? দেশের জন্য কী ভূমিকা পালন করেন?

শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে স্লোগান দিচ্ছে "হাফপাস ভিক্ষা নয়, আমাদের অধিকার" সড়কে আমরা কী নিরাপদ?  শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী ভাষা বলে দিচ্ছে রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা কতটা নাজুক। শিক্ষা কোনো পণ্য নয় শিক্ষা আমাদের অধিকার আর সেই অধিকার রাষ্ট্রকে দিতে হবে কিন্তু তা না হয়ে রাজপথে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের দ্বারায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করা হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়ে অন্য এক শিক্ষার্থীকে কিভাবে নির্যাতিত করতে পারে? যারা শিক্ষার্থীদের হামলা করে তারা আসলে তো শিক্ষার্থী? তাদের রাজনৈতিক দলের আদর্শ কি এভাবে হেলমেট পড়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে যৌক্তিক আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া। যে সব শিক্ষার্থী সন্ত্রাস করে তারাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান আজকে কেন তারা সন্ত্রাসের পথে? কারা সন্ত্রাসী তৈরী করে?  তাদের উদ্দেশ্য কী? হাফ পাস’ নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীসহ সারাদেশে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। করোনায় দেঢ় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে এমনিতেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধমকে গেছে। বর্তমানে যখন আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা শূণ্যের কোঠায় তখন শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া নানামুখী সংকটের মধ্যেও স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্ঠা করতেছে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের লেখাপড়া ছেড়ে রাজপথে নিরাপদ সড়ক, গণপরিবহনে নিরাপত্তা ও হাফ পাসের দাবিতে আন্দোলন করছে। শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের দাবির বিষয়টি নতুন কোনো ইস্যু নয় আমাদের পূর্বপুরুষেরা অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন আমলে শিক্ষার্থীরা যানবাহনে হাফ ভাড়া দেওয়ার অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে মিছিল করেছিল। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির মধ্যে ‘হাফ ভাড়া’ নির্ধারণ। সেই সময়ে ছাত্র সংগ্রামের পরিষদের সর্বাত্বক আন্দোলনের মুখে পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসক শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এই ১১ দফা দাবির মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনে অর্ধেক ভাড়া করতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন ও দুই লক্ষ মা বোনের নির্যাতনের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। আজ স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে সেই একই আন্দোলন করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে পাকিস্তান শাসক ও বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? ২০১৮ সালে আমরা কিশোর বিদ্রোহ দেখেছি। ওই বিদ্রোহে শিক্ষার্থীরা ‘নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের ৯ দফা দাবিতে  আন্দোলন করেছিল। আর ওই দাবি গুলোর মধ্যেও হাফ ভাড়ার বিষয়টি যুক্ত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় আন্দোলন থামাতে রাষ্ট্র দাবি গুলো মেনে নিলেও তা এখন পর্যন্ত টালবাহানা করতেছে। এখনও সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলছে। সেই মৃত্যুর মিছিল কবে শেষ হবে তার যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেই আবার উত্তর নেই। রাষ্ট্রের পুরো সিস্টেম হয়ে গেছে বিশৃঙ্খল ফলে শিক্ষার্থীদের সংকট গুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন রাষ্ট্র সংস্কার করা কিন্তু সংস্কারের কাজ করবে কে? আমাদের দেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাস্তায় চলাচল করে। ফলে শিক্ষার্থীরা ভাড়া অর্ধেক দিলে সেখানে মালিক ও শ্রমিকদের সমস্যা হওয়ার তো কথা নয়। তবে হাফ পাস’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন কোনো শ্রমিকের বেতন কমানো না হয় সে বিষয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের দেশে যে সকল  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানাধীন সেই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। সংবিধানে শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা করতে হবে সর্বজনীন এবং সেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রকে দিতে হবে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি বাসমালিকদেরও ভূমিকা নিতে হবে। নিজেদের গাড়ির কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তার অতীত ইতিহাস ও পূর্বপরিচয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধী যেই হোক না কেন দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আজকের ছাত্র দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। 

তাই  শিক্ষার্থীদের রাজপথে নয়, শ্রেণিকক্ষের ক্লাসেই দেখতে চাই। করোনা অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর কোনো ক্ষতি দেখতে চাই না। জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব।  
(প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, ডেল্টা টাইমস্ কর্তৃপক্ষের নয়।  লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার ডেল্টা টাইমস্ কর্তৃপক্ষ নেবে না।)

লেখক: প্রাবন্ধিক ও  সংবাকর্মী





ডেল্টা টাইমস্/রাশেদুজ্জামান রাশেদ/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]