সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২ ২ মাঘ ১৪২৮

গ্রাহকের তথ্য বিক্রি, ই-কমার্সে আস্থা তলানিতে
আনন্যামা নাসুহা
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৩ পিএম আপডেট: ২৭.১১.২০২১ ১২:১১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ই-কমার্স ব্যবসা হল অনলাইন ভিত্তিক একটি মার্কেটপ্লেস যেখানে আপনার ওয়েবসাইট তথা অনলাইন শো-রুম থাকবে এবং কাস্টমাররা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে পন্য অর্ডার করবে। নির্ধারিত মূল্য পরিশোধে ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বা মালিক সে পণ্য কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেবে। অর্থাৎ শো-রুমে ক্রেতার শারিরীক উপস্থিতি ছাড়াই অনলাইনে যেকোনো পণ্য  ক্রয়-বিক্রয় করার মাধ্যমটি হলো ই-কমার্স ব্যবসা। ই-কমার্স ব্যবসায় সুবিধা যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে ভোগান্তি। মহামারিতে প্রায় স্থবির অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল ই-কমার্স খাত। এ সময়ে ই-কমার্সের ব্যবসাও বেড়েছে কয়েক গুণ কিন্তু ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, ধামাকা শপিং, নিরাপদ ডটকমসহ কয়েকটি ই-কমার্সের ভয়ংকর ছোবলে খাতটি যেমন ধ্বংসের পথে, তেমনি গ্রাহকের আস্থা নেমেছে তলানিতে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সিস্টেমের অনুমতি দেয়। এরপর গত এক দশকে ই-কমার্স খাতে ব্যবসার গন্ডি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে গেছে। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ ই-কমার্স সাইট রয়েছে। ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে দেড় লাখের বেশি। দেশে ই-কমার্স খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৭৫ শতাংশ। খাতটির আকার ৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সাল নাগাদ এ খাতের আকার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দারুণ সম্ভাবনাময় এই ব্যবসায়ীক পদ্ধতিতে অনলাইনে মূল্য পরিশোধ করে পণ্য না পেয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেক গ্রাহক, এ খাতের সম্ভাবনা এখন নিভু নিভু গ্রাহকদের আস্থাহীনতায়। প্রতারণা, নকল পণ্য সরবরাহ, সময়মত পণ্য ডেলিভারি না করা, রিফান্ড না করা সহ বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গ্রাহকের তথ্য গোপনে বিক্রির মত ঘটনাও! অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্ট,  বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আলেশা হোল্ডিংসের একটি অঙ্গসংস্থা। ঢাকায় এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের ই-কমার্স ব্যাবসায়ীক যাত্রা শুরু করে ৭ জানুয়ারি,২০২১ সালে। বাংলাদেশে ই-ভ্যালি থেকে শুরু করে একের পর এক বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা যখন প্রতারণার অভিযোগে আটক হচ্ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যত তালা পড়ছিল, তখনও আলেশা মার্টকে দেখা গেছে ব্যাপকভিত্তিক বিপণন প্রচারণা চালাতে। প্রতিষ্ঠানটি নানারকম কার্ডের প্রচলন করে, যেগুলো বয়স্ক, মুক্তিযোদ্ধাসহ নানা জনগোষ্ঠীকে লোভনীয় সব ডিসকাউন্ট দিচ্ছিল। অবশ্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অভিযোগ যখন সামনে আসতে শুরু করেছিল সম্প্রতি তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মত আলেশা মার্টকেও নজরদারিতে রেখেছিল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। এরপরই বের হয়ে আসে তাঁদের কর্মকান্ড। চটকদার বিজ্ঞাপন, বিশাল ছাড়ের প্রলোভন দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে পণ্য না দেওয়ার বিষয়টি অধিকাংশ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান করেছে। তবে আলেশা মার্ট ক্রেতার সঙ্গে যে প্রতারণা করেছে সেটি অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। আলেশা মার্ট অভিনব কায়দায় ক্রেতার তথ্য সংগ্রহ করে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। বিশেষ করে আলেশা কার্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতার সঙ্গে এই প্রতারণাটি করে আসছিল। 

সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর আলেশা মার্টের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় আলেশা মার্টের ব্যবসার ধরন, পণ্য বিক্রি, চটকদার বিজ্ঞাপন এবং ক্রেতা ঠকানোর নানা বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়। আলেশা মার্টের প্রধান কার্যালয়ের তথ্য যাচাইয়ের সময় ভোক্তা অধিদফতর জানতে পারে, আলেশা মার্ট গোপনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ক্রেতার তথ্য বিক্রি করে দিচ্ছে। বিষয়টি ক্রেতাদের অবগত করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা স্বীকার করেন, ক্রেতারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। আলেশা মার্ট কার্ডের মাধ্যমেও রমরমা বাণিজ্য করছে। কার্ডের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৮০০ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে আলেশা মার্ট। এই কার্ডের মাধ্যমে ডিসকাউন্টে পণ্য বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে কাপড়ের দোকান, খাবারের হোটেল, আবাসিক হোটেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আলেশা কার্ড ৭ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।আলেশা মার্ট মূলত এই কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকরা কোন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্য কিনতে বেশি যাচ্ছেন, কী ধরনের পণ্য বেশি কিনছেন, কোন ক্রেতা কেনাকাটায় বেশি অর্থ ব্যয় করছেন- এসব তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতার একটি ডাটা ব্যাংক তৈরি করে। এই ডাটা ব্যাংক তৈরির জন্য তারা ইতোমধ্যে ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগও করেছে। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে গ্রাহকের এইসব ব্যক্তিগত গোপন তথ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে আলেশা মার্ট। অনেক প্রতিষ্ঠান কাস্টমার বিহেভিয়ার বা গ্রাহকরা কোন পণ্য বেশি কিনছে, কোন কাস্টমার বেশি অর্থ ব্যয় করছে সে সম্পর্কে জানতে চায়। পরে নির্ধারিত গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো যোগাযোগ করে তাদের পণ্য বিক্রির জন্য। আপাতদৃষ্টিতে এটা স্বাভাবিক ঘটনা মনে হলেও গ্রাহককে না জানিয়ে অন্য জায়গায় তার তথ্য বিক্রি করে দেওয়া ব্যবসার অনৈতিক দিকটিই তুলে ধরে। আলেশা সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী অনৈতিক এ ব্যবসা করে আসছিল আলেশা মার্ট।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না দিয়ে ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। তাদের এই প্রতারণার চরম পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পদ্ধতি। না জানিয়ে গ্রাহকের তথ্য অন্যত্র বিক্রি করা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়। স্বল্প মূল্যে ভাল পণ্য পাওয়ার আশায় গ্রাহকদের এরকম বোকামি ও কার্ড ব্যবহার করে তথ্য প্রদান করা মূলত আমাদের ত্রুটির মধ্যে পরে, কিন্তু এসব তথ্য গোপনে বিক্রি করা অবশ্যই আইন বিরোধী, এমতাবস্থায় গ্রাহকদের অভিহিত না করে সেটিকে ভিন্নধর্মী ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত করে ই-কমার্সের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা তলানিতে নিয়ে ই-কমার্সের সুন্দর ভবিষ্যত এখন হুমকির মুখে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করা প্রয়োজন।দেশের ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আনতে একটি রেগুলেটরি কমিশন গঠন করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং মানি লন্ডারিং আইনে কিছু সংশোধন আনা, নিবন্ধন বিহীন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা পরিচালনা করতে না দেওয়া সহ বেশকিছু পরিবর্তন আনা দরকার। সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও গ্রাহকদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে এরকম প্রতারণা এবং তথ্য পাচার থেকে রক্ষা করতে। এছাড়াও ব্যবসার নামে গ্রাহকদের তথ্য পাচার, প্রতারণা ,আইনবিরুদ্ধ কাজ থেকে দূরে থেকে ব্যবসার মুলনীতি কে প্রশ্নবিদ্ধ না করার জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ীর নিজের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। একবিংশ শতাব্দীর উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের একটাই আশা ই-কমার্স গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 





ডেল্টা টাইমস্/আনন্যামা নাসুহা/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]