মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৯

/ জলবায়ু পরিবেশ
-ফাইল ছবি

পরিবেশ বলতে সাধারণত বুঝায় মানুষের বসবাসের জন্য উপযুক্ত এলাকা। মানুষের চারপাশের আলো, বাতাস, মাটি, পানি, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, খাল-বিল, বন-জঙ্গল, পশু-পাখি সব মিলিয়েই পরিবেশের সৃষ্টি। প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশেই একদিন এই পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল জীবনের অগ্রযাত্রা। সেদিন বায়ুমন্ডলের অফুরন্ত অক্সিজেন, খাদ্য ও পানীয় জলের বিশুদ্ধতা জীবনের বিকাশকে সম্ভব করে তুলেছিল। তারপর এলো মস্তিষ্কবান মানুষ। কিন্তু মানুষ পৃথিবীতে নিজের অজান্তেই ডেকে আনলো নিজের সর্বনাশ। সেই সর্বনাশ হলো পরিবেশ দূষণ। লাখ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণীর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তখন প্রকৃতি ও পরিবেশে ভারসাম্য ছিল এবং তা রক্ষা করত প্রকৃতি ও পরিবেশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের বিজয় গৌরবে মানুষ পৃথিবীর পরিবেশকে করেছে বিষাক্ত। আগুন আবিষ্কারের পর থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পুড়তে থাকল। তাতে বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের মাত্রাও কমতে থাকল। তারপর এলো বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎ শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি। অরণ্য খনির কয়লা এবং ইউরেনিয়াম পুড়তে থাকল এবং বায়ুমন্ডল মাত্রাতিরিক্তভাবে দূষিত হতে থাকল। অথচ বায়ুমন্ডল শোধনের কোন ব্যবস্থাই করা হলো না। মানুষের এই কান্ডজ্ঞানহীন পরিবেশ দূষণের ফলে পৃথিবীতে আজ ক্ষয় ও অবক্ষয়ের মহামারি এসে জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ জল, মাটি, বায়ুর উপর পড়ছে প্রচন্ড চাহিদার চাপ। শুরু হয়েছে বনজ সম্পদ নষ্টের আত্মঘাতী খেলা। ফলে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণে খাদ্যদ্রব্য মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
পরিবেশ দূষণ প্রণালীকে দুভাগে ভাগ করা যায়। (১) প্রাকৃতিক, (২) কৃত্রিম। প্রাকৃতিক দূষণের মধ্যে রয়েছে সীসা, পারদ, সালফার, ডাই-অক্সাইড, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড ইত্যাদি। এর কিছু কিছু মলমূত্র ও শরীরের পচন থেকেও সৃষ্টি হয়। জনসংখ্যা ও গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলেও পরিবেশ দূষিত হয়। জ্বালানি দহনের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া পরিবেশকে দূষিত করে। কীটনাশক, গুড়াসাবান, ঔষধপত্র, প্রসাধন সামগ্রী ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো উৎপাদনের সময় কারখানা থেকে যে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া বের হয় এগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এসব নিয়েই বেশি দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশুদ্ধ বায়ু প্রাণীর বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান। অথচ বিশ্ব জুড়ে আজ ক্রমবর্ধমানহারে বায়ু দূষণ চলছে। জ্বালানী তেল কয়লা ইত্যাদি পুড়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করছে যা বায়ু দূষণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। তাছাড়াও কুয়াশা, তেল ও কয়লা দহনের ফলে সৃষ্ট হচ্ছে ধোঁয়া যার ক্ষতিকারক ক্ষমতা মারাত্মক। এর ফলে মাথাধরা, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানী, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সার জাতীয় রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ধূমপানের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া মিলে যে আলোক রাসায়নিক ধোঁয়ার সৃষ্টি করে তার কারণেই এলার্জিজনিত রোগের সৃষ্টি হচ্ছে বেশি।
পানির অপর নাম জীবন। আবার দূষিত পানি মৃত্যুরও কারণ। ভারী ধাতু, হ্যালোজেন, নিষিক্ত হাইড্রো-কার্বন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, পেট্রোলিয়াম, তেজস্ক্রিয়তা শহরের নির্গমনকারী বেয়ে আসা দূষিত তরল আবর্জনা পানি দূষণের অন্যতম কারণ। পানি দূষণের ফলে মাছ দূষণের শিকার হচ্ছে। গাড়ির হর্ন, কারখানার বিকট শব্দ, আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, রেডিও-টিভির শব্দ, লোকজনের চিৎকার, উৎসবের উম্মাদনা, মাইকের চড়া সুর সব মিলে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক শব্দ দূষণ। শব্দ দূষণের পরিনামে মানুষের শ্রবণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটে, মানসিক বিপর্যয় দেখা দেয়, রক্তচাপ বাড়ে। পারমাণবিক যুদ্ধ, পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে তেজস্ক্রিয় দূষণের বিপদ সবচেয়ে বেশি। আজ বায়ুমন্ডলে নেই বিশুদ্ধতা, পরিবেশে নেই সুস্থজীবনের প্রতিশ্রুতি। যক্ষ্মা, ক্ষয়রোগ, শ্বাসরোগ, হৃদরোগ, উদরাময়, রক্তদুষ্টি, ¯œায়ুরোগ ইত্যাদির অভিশাপে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। পৃথিবীর দূষিত বায়ুমন্ডল আজ হয়ে উঠেছে রোগ-জীবাণুর বংশ বিস্তারের স্বর্গভূমি। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ পরিণামের কথা ভেবে বিশ্বের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা খুবই চিন্তিত। এর প্রতিকারের একমাত্র উপায় পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য আনুপাতিকহারে অরণ্য সৃষ্টি এবং বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ। বায়ু দূষণের সহজ প্রতিকার হচ্ছে যে সকল কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করা। ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এছাড়া শব্দদূষণ, তেজস্ক্রিয় দূষণ, পানি দূষণ বন্ধ করা দরকার।
সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও এখন ৫ জুন পরিবেশ দিবস হিসেবে পালিত হয়। সুখী ও সুন্দর জীবনের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতই প্রয়োজন দূষণ মুক্ত পরিবেশের। পরিবেশ দূষণের প্রতিকারের জন্য পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে পরিবেশ সম্পর্কে সর্বাগ্রে সচেতন করে তুলতে হবে। মানুষকে এই পৃথিবীতে বাঁচতে হবে। তাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। মানুষের অস্থিত্ব রক্ষার জন্যই পরিবেশকে দূষণ মুক্ত রাখা দরকার।