সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

খাগড়াছড়ির রহস্যময় আলুটিলা গুহা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ২৫ জানুয়ারী ২০১৯

/ ফিচার
-ফাইল ছবি

আলুটিলা গুহা বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক গুহা। খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মূল শহর থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে সমুদ্র সমতল থেকে ৩ হাজার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট আলুটিলা বা আরবারি পাহাড়ে আলুটিলা গুহা বা রহস্যময় সুড়ঙ্গ অবস্থিত। স্থানীয়রা একে বলে মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা। আলুটিলা খাগড়াছড়ি জেলার সবচেয়ে উঁচু পর্বত।

নামে এটি টিলা হলেও মূলত এটি একটি পর্বত শ্রেণী। বিশ্বে যতগুলো প্রাকৃতিক গুহা আছে আলুটিলা সুড়ঙ্গ বা গুহা তার মধ্যে অন্যতম। এ গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। খাগড়াছড়ি বেড়াতে এলে বা সাজেক ভ্যালিতে যাওয়ার পথে সবাই অন্তত একবার নাকি গুহাটি ঘুরে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সাজেক যাওয়ার আগে এর দর্শন নিয়ে যাব।

দুটি চান্দের গাড়ি থেকে ১৫ সদস্য নামতে গিয়ে প্রথমে থমকে যাই। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের মূল গেটের পাশে দুটি শতবর্ষী বটবৃক্ষ। শান্ত নিবিড় ছায়াবীথি। মাথা উঁচু করে আকাশটা ছুঁয়ে আছে।

সময় স্বল্পতার কারণে টিম লিডারের ডাকাডাকি। পর্যটন কেন্দ্রের গেট থেকে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে নির্দেশনা মোতাবেক প্রত্যেকে মশাল কিনে নিলাম। প্রথমে ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট কয়েক হেঁটে পেয়ে গেলাম পাহাড়ি সরু পথ। পাহাড়ে ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে এ পথটি। এ পথটি বেয়ে নিচে নেমেই চোখে পড়ল একটি ছোট ঝরনা।

 

পেছনে ফিরে এসে এবার বাম দিকের রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম রহস্যময় গুহার সন্ধানে। কিছুক্ষণ পর চোখে পড়ল একটি বিশ্রামাগার ও ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে খাগড়াছড়ি শহরের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যায়। অবলোকন করা যায় আকাশ-পাহাড় আর মেঘের মিতালীর মায়াবী এক আবহ। সত্যিই এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়, হৃদয় মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অপূর্ব।

একটু এগিয়ে দূর থেকে দেখা গেল আলুটিলার গুহামুখ। আগে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হতো গুহামুখে। কিন্তু এখন পর্যটন কর্পোরেশন একটি পাকা রাস্তা করে দিয়েছে। ফলে খুব সহজেই হেঁটে যাওয়া যায় গুহামুখে। পাকা রাস্তা শেষ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে পাড়ি দিলাম প্রায় ২৬৬টি সিঁড়ি। পেয়ে গেলাম কাক্সিক্ষত সেই গুহা, আলুটিলা গুহা।

কাছে যেতেই গা ছম ছম করা পরিবেশ। সারা শরীর শীতল হতে লাগল। কে যাবে আগে তাই নিয়ে তর্ক-বির্তক। কেউ আবার মশাল জ্বালাতে ব্যস্ত। গুহামুখটির ব্যাস প্রায় ১৭-১৮ ফুট। সবাইকে পাশ কাটিয়ে আমি নিজেই প্রথমে প্রবেশ করলাম। গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। কোনো ধরনের সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। একেবারেই পাথুরে গুহা।

গুহার ওপর দিক থেকে টিপটিপ পানি পড়ছে; নিচ দিয়ে বইছে ঝরনা প্রবাহ। খুব সাবধানে পা ফেলে সামনে এগোচ্ছি। সুড়ঙ্গের তলদেশ খুব পিচ্ছিল। তাই খুব সাবধানে মশাল বা আলো নিয়ে গুহা পাড়ি দিতে হচ্ছে। তার মধ্যে গুহার ভেতরের ছবি তোলার প্রতিযোগিতা তো আছেই। জেনে রাখা ভালো, গুহাটি একেবারেই নিরাপদ। দেখতে অনেকটা ভূগর্ভস্থ টানেলের মতো যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ ফুট।

গুহার ভেতরে জায়গায় পানি জমে আছে, রয়েছে বড় বড় পাথর। গুহাটির উচ্চতা মাঝে মধ্যে এতটাই কম যে, আমাদের হামাগুড়ি বা নতজানু হয়ে পাড়ি দিতে হচ্ছে। প্রায় ১২-১৫ মিনিট হাঁটার পর বাইরের সূর্যের আলো চোখে পড়তে শুরু করেছে। যেমনটা দেখে ছিলাম ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে সকালের সূর্যের রশ্মি ঘরে প্রবেশ করা। আবার সিঁড়ি বেয়ে একটু ওপরে উঠে আগের পথ ধরে মূল গেটে আসা।

লোকমুখে শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খাগড়াছড়িতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে এখানকার জনগণ এ পর্বত থেকেই বুনো আলু সংগ্রহ করে তা খেয়ে বেঁচে থাকত। তারপর থেকে এ পর্বতটি আলুটিলা নামেই পরিচিতি লাভ করে। এখনও এখানে নাকি প্রচুর পরিমাণে বুনো আলু পাওয়া যায়।

সতর্ক : গুহার পাথরগুলো পিচ্ছিল হওয়ার কারণে পা পিছলে যায় এমন স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার না করাই ভালো। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য মোবাইল টর্চ বা টর্চ লাইট নিয়ে যেতে পারেন। অ্যাডভেঞ্চার ও ভ্রমণপিপাসুদের জীবনে অন্তত একবার হলেও এ গুহাটি ঘুুরে আসা উচিত।

যাতায়াত : ঢাকা থেকে শান্তি, শ্যামলী, হানিফ ও অন্যান্য পরিবহনের বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন। ভাড়া পড়বে ৫২০ টাকা। এছাড়াও বিআরটিসি এবং সেন্টমার্টিন পরিবহনের এসি বাস খাগড়াছড়ি যায়। খাগড়াছড়ি শহর থেকে চান্দের গাড়ি অথবা লোকাল বাসে চড়ে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে যেতে হবে। অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বা দুজনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলেও যেতে পারবেন।

খাওয়া-দাওয়া : খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই পানখাই পাড়ায় ঐতিহ্যবাহী সিস্টেম রেস্তোরাঁর অবস্থান। এখানে খাগড়াছড়ির ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়। তাছাড়া শহরজুড়ে বিভিন্ন মানের খাবার হোটেল পাবেন।

রাত যাপন : খাগড়াছড়িতে পর্যটন মোটেলসহ বিভিন্ন মানের থাকার হোটেল আছে। এক্ষেত্রে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিতে পারেন।