বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাবধান! খেজুর রসে প্রাণঘাতী নিপা ভাইরাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯

/ স্বাস্থ্য

এবিএম সাইফুল ইসলাম গাজী:

নিপা ভাইরাস! সেটাতো মানুষের জন্য এক মৃত্যুর পরোয়ানা। এটা এইচআইভির চেয়ে ও মারাত্বক। কারণ এ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হলে কয়েক বছর পরেও মানুষ মারা যেতে পারে। কিন্তু নিপা ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হলে মানুষ বেশ কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যায়। সারা বিশ্বে এ রকম প্রাণঘাতী অনেক ভাইরাস আছে। যেমন- ইবোল ভাইরাস, সার্স ভাইরাস, শুকুরের (সোয়াইন ফ্লু) ভাইরাস, করোনা ভাইরাস, বার্ড ফ্লু ইত্যাদি। ২০০৫ সালে টাঙ্গাইল জেলায়, খেজুরের রস খেয়ে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ১২ জন মানুষ। এর মধ্যে ১১ জনই মারাই যায়। আর এই ঘটনা সমকালীন সময়ে সংবাদ পত্র ও মিডিয়াতে প্রচারিত হয়ে ছিল। তখন টনক নড়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের।

তাহলে কি অনেকের প্রিয় শীতকালীন রস খাবে না ? হ্যাঁ খাওয়া যাবে, সেই রস চুলার আগুনে গরম করে। আর যে সব এলাকার মধ্যে, এই ভাইরাসের প্রোকোপ নেই। সেখানকার লোকেরা এই রস কাঁচাই খেতে পারে। তার পর এই খবর দেশ থেকে আমেরিকা পযর্ন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই নিপা ভাইরাস নিয়ে এইতো কিছু দিন আগে একটি ব্রিটিশ মিডিয়া একটি জরিপ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। নিচে লিখে দিলাম সেই প্রতিবেদনেরই এক ঝলক। একজন মার্কিন গবেষক দাবি করেছেন- বাংলাদেশের বনাঞ্চল ধ্বংসের কারনে নিপা ভাইরাসের বিস্তার বাড়ছে। এই প্রাণঘাতী ভাইরাস বাদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। এতে আক্রান্ত হয়ে ৭৮% রোগীই মারা যায়। এই ভাইরাস বাংলাদেশের স্বাস্থমন্ত্রণালয়কে ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশ সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রন ও গবেষনা ইন্সটিটিউসের পরিচালক বলছিলেন- কিভাবে এই রোগের বিস্তার ঘটছে। নিপা ভাইরাসটা বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে। এটা মূলত জেনেটিক রোগ। এই ভাইরাস পশু-পাখি থেকে ও হয়। তবে এর মূল বাহক হল বাদুড়। কিন্তু বাদুড় এই ভাইরাস বহন করলেও, বাদুড় আক্রান্ত হয় না।

এই ভাইরাস গাছের ফল খাওয়া থেকেও ফলের মাধ্যমে মানুয়ের মধ্যে আসে। বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এই রোগে মানুষ সবচেয়ে বেশি মারা গেছে। সেই জন্য বিজ্ঞানীরা এই এলাকার নাম দিয়েছেন নিপা বেল্ট। আবার এই নিপা বেল্টের মধ্যে আবার দেখা গেছে, নিপা ভাইরাস মুক্ত এলাকা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকসিন বিশ্ব বিদ্যালয়ের গবেষক নিকাহান এই বিষয় নিয়ে কৌতুহলী হয়ে- এদেশে একটি জরিপ চালান। আমরা জানি যে বাংলাদেশের সব এলাকার মানুষই খেজুরের রস সংগ্রহ করে ও খায়। কিন্তু কোন এলাকায় বেশি ও কোন এলাকায় কেন একে বারেই নাই। রাতে খেজুর গাছে তারা ইনফারেট ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়ে ছিলেন। ফলাফলে দেখা গেছে, যে সব এলাকায় গাছ পালা বেশি কাটা হয়েছে। বনভূমি কম। দেখা গেছে ঐ এলাকায় বাদুড় ও মানুষ কাছাকাছি থাকে। সেখানে নিপার প্রদুভাব বেশি। আর নিপা বেল্টের মধ্যে সব গ্রামেই বাদুড়ের বসতি খুবই বেশি। যে এলাকায় ১০% বনভূমি কাটা হয়েছে, সে এলাকায় এই ভাইরাসের বিস্তার ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়াও নিপা বেল্টের বাইরে চট্রগ্রাম নোয়াখালি ও কুমিল্লাতে এই ভাইরাসের বিস্তার দেখা গেছে। আবার সব বাদুড় এই ভাইরাস বহন করে না। এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়া রোগীর ৭৮% মারা যায়। এমনই একটা গবেষনা চালনা হয়েছিল-উত্তর বঙ্গের নওগাঁ জেলায়। আর তাতে ১৯ টি ফল খাদক বাদুড়ের মধ্যে মাত্র ২টি বাদুড়ে নিপা ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিল। তবে পশু-পাখির মধ্যে পাওয়া যায়নি। আর মানুষ থেকে মানুষের আক্রান্ত হবার সম্ভবনাও ৩৩ %।

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সবারই জ্বর হয়। অজ্ঞান হয় ৭৪%, খিচুনি হয় ৩৩% ও মাথা ব্যথ্যা ৪২ % শ্বাসকষ্ট হয় ৮% রোগীর। এই সমস্ত হবার পর ৯২% রোগী মারা যায়। গবেষকরা এই রোগটিকে মস্তিষ্কের প্রদাহ বলে থাকেন। তবে মানুষের দ্বারা এর বিস্তার বেশি দূরে যেতে পারে না। তার আগেই মানুষ মারা যায়। পরিশেষে যে কথা না বললেই নয়- খেজুরের রস ঠান্ডা ও খাওয়া যাবে, যদি না সেখানে কোন নিপা ভাইরাসওয়ালা বাদুড় ঐ খেজুর গাছের রস না খেয়ে থাকে। তাহলে সেই রস আপনী খেতে পারেন। আবার গরম করে ভাইরাস মেরেও আপনী খেজুর রস খেতে পারেন নিশ্চিন্তে। সে ঝুঁকি যাইহোক- ঠান্ডা বা কাচা খেজুরের রস না খাওয়াই ১০০% নিরাপদ।