মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আধুনিক যন্ত্রের জাঁতাকলে গরুর হাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ৬ নভেম্বর ২০১৯

/ কৃষি

প্রদীপ অধিকারী / পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) সংবাদদাতাঃ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে প্রায় ৮০ ভাগ লোক কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। আর এ কৃষি কাজে এক টুকরো লোহার ফাল দিয়ে কাঠমিস্ত্রির হাতে তৈরি কাঠের লাঙল, জোয়াল আর বাঁশের তৈরি মই ব্যবহার করে জমির চাষাবাদ করতেন। কৃষিকাজে ব্যবহৃত এসব স্বল্প মূল্যের কৃষি উপকরণ এবং গরু দিয়ে হালচাষ করে তারা যুগের পর যুগ ধরে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে এসবের ব্যবহার আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। যান্ত্রিক আগ্রাসনে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরুর হাল লাঙল জোয়াল।
পরিবেশ বান্ধব লাঙল-জোয়ালের জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক পাওয়ারটিলার আর ট্রাক্টর। আগে লাঙল ছাড়া চাষাবাদের কথা চিন্তা করা যেত না। কিন্তু ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের মতো যন্ত্রের সাহায্যে চাষাবাদে আগের তুলনায় সময়, শ্রম এবং অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে কৃষক আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে চাষাবাদ করছে। এতে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লাঙল, জোয়াল, মই ও হালের বলদ।
বর্তমানে প্রায় সব কৃষক জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। অপরদিকে লাঙল-মইসহ কৃষি সরঞ্জাম তৈরির কারিগড়দের হাতে কাজ না থাকাই অনেকেই এই পেশা ছেড়ে নতুন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
প্রাক্তন ইউপি সদস্য কৃষক নাজির হোসেন বলেন, এক সময় লাঙল, জোয়াল, মই ও বলদ ছাড়া চাষাবাদ কল্পনা করা যেত না। কিন্তু যান্ত্রিকতার এ যুগে সব হারিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া আগের মতো লাঙল দিয়ে চাষাবাদও করছে না মানুষ।
কৃষক সিরাজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বাজারে হালের বলদের দামও চড়া। এসবের কারণে এলাকার কৃষক লাঙল- জোয়ালের ব্যবহার কমে দিয়েছে।
কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি আগে গরুর হাল চাষি ছিলাম। নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতেও চাষ করতাম। এতে ভালই রোজগার হতো। কিন্তু এখন পাওয়ার টিলার, ট্রক্টর আসায় তা দিয়েই নিজের জমি চাষ করছি।
কৃষিবিদদের মতে, লাঙল-জোয়াল দিয়ে হালচাষ পদ্ধতি পরিবেশ বান্ধব। কারণ গরুর গোবর থেকে নির্ভেজাল জৈব সার পাওয়া যায়। এই সার জমির উর্বরা শক্তি ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে। তাই এই পদ্ধতি কৃষকের জন্য লাভজনক ও পরিবেশ সহায়ক ছিল। তবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হালচাষের সময় কম লাগে। এছাড়া অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হয় না। এছাড়া এ পদ্ধতির হালচাষে কৃষক অনেকটাই ঝামেলামুক্ত বলে মনে করেন।
কিন্তু আজকাল সময়ের আবর্তে এসব গরুর হাল, কৃষি উপকরণ কাঠের লাঙল, জোয়াল, বাঁশের মই হারিয়ে যেতে বসেছে এবং হাল-কিষাণ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ যুগে মানুষের অসীম চাহিদা আর অভাবময় জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে আবির্ভূত হয়েছে দামি দামি আধুনিক যন্ত্র। সঙ্গে এসেছে ফসলের বীজ, বপন- রোপণ এবং ফসল কাটামাড়াই করার যন্ত্র। আর এসব যন্ত্র চালাতে মাত্র এক থেকে দুজন লোক প্রয়োজন। ফলে বিত্তবান কৃষকরা ওই যন্ত্র কিনে মজুরের ভূমিকায় কাজ করলেও গ্রামের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দিনমজুরের জীবন থেকে ওই সব ঐতিহ্যময় স্মরণীয় দিন চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।