মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

এশিয়ার সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯

/ পর্যটন

খালেদ মাছুম সিলেট থেকে : 

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদ নদী, হাওর বাওর। আর এই হাওর বাওরের একটা বিশাল অংশের অবস্থান সিলেট বিভাগে। তার মধ্যে এশিয়ার সবচেয়ে বড় হাওর সিলেট বিভাগে হাকালুকি। সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত জল সুন্দরী হাকালুকি। এই হাওরের পশ্চিমে ভাটেরা পাহাড় এবং পূর্বে পাথারিয়া পাহাড় হাকালুকির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে দ্বিগুণ। ছোট বড় ২৩৮টি বিল, ১০টি নদী নিয়ে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের এই হাওর বর্ষায় নদী খাল প্লাবিত হয়ে ২৩ হাজার হেক্টরের বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়। মৌলভীবাজারে ২০০ আর সিলেটে রয়েছে ৩৮টি বিল। হাওরের ৮০ ভাগ মৌলভীবাজারে আর ২০ ভাগ সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে ৬০ ভাগ, কুলাউড়ায় ১২ ও জুড়ি উপজেলায় রয়েছে ৮ ভাগ। বর্ষায় হাকালুকি সাজে অপার সাজে। উত্তাল যৌবনের জয়গানে মুখরিত হয় হাওর। নীল আকাশের সাথে জলরাশির মিতালি বিমোহিত করে পর্যটকদের। বর্ষায় হাকালুকির বিস্তৃত জলরাশি দেখলে মনে হবে এ যেন মহা সাগর। যেদিকে চোখ যায় শুধু রুপোলি জলের হাতছানি। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে জলের হিজল, তমাল ডালিমসহ নানান জলজ বৃক্ষ। গাছের ডালে অচেনা পাখিদের আনাগোনা। আবহাওয়াভেদে এখানে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাখিরা এসে আশ্রয় নেয়। যে কারণে হাকালুকি শুধু হাওরই নয় পাখির বৃহৎ অভয়াশ্রমও। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাই হাকালুকি হাওরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল এই হাওরে বাস করে স্থানীয় লাখো মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা। তবে শুষ্ক মৌসুমে বদলে যায় হাকালুকির চিরচেনা রূপ। তখন আর পানি চোখে পড়ে না। অথৈ পানির হাওর তখন রূপ বদলে মেটে সবুজ মরুভূমির মতো দেখায়। তৈরী হয় অসীম দিগন্তের অচেনা পথ। এরূপ যেন আরো আকর্ষণীয়। শীতকাল আসতেই দেখা যাচ্ছে ভোরের হাকালুকি  মস্তবড় দেহ নিয়ে শীতের কাছে যেন হাকালুকির আত্মসমর্পন। বিস্তৃত হাওরের বুকে তখন কোথাও ধানী জমি তো কোথাও মহিষের বাথান। বিলগুলো তখন ভেসে ওঠে হাওরের বুকে। প্রায় ১১২ প্রজাতির মাছের চারণক্ষেত্র হাকালুকির বিলে ধুম পড়ে মাছ ধরার। বিলের তীরে বসে মাছের পাইকারি হাট। দেশী ও সুস্বাদু মাছের জন্যও বিখ্যাত এই হাওরে ঠিকে আছে অনেক বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ। হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সংরক্ষিত একটি জলাভূমি হাকালুকিকে দেশের অন্যতম মাদার ফিসারিজ। শীতকালে এখানে লেজা হাঁস, সরালি, পাতিসরালি, রাজ সরালি, বেলেহাঁস, ফুলুরি হাঁস, পিয়াং হাঁস, বালিহাঁস, ধলা বালিহাঁস, মরচে রঙের ভুতিহাঁস, বালিহাঁস, পাতি তিলা হাঁস, নীল মাথা হাঁস, উত্তুরে লেঞ্জা হাঁস, গিরিয়া হাঁস, উত্তুরে খুন্তি হাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস এবং সারাবছর চখাচখি, জলপিপি, ময়ুরলেজা পিপি, ভুবন চিল, শঙ্খচিল, পানকৌড়ি, ধূসর বক,  পাতি পানমুরগি, নিউ পিপি, মেটেমাথা টিটি, খয়রা কাস্তে চরা, তিলা লালসা, শামুকভাঙা, সাপ পাখি, গেওয়ালা বাটান, কানা লেজ জৌরালি, বিল বাটান, পাতি সবুজলা, লালচে বক, ধূসর বক, ঢুপনি বক, পানকৌড়ি, পাতি চ্যাগা, ভুবন চিল, ফিঙে, সাদা বক, রাঙা বক, কানি বক, দেওটা, কালামাথা, বিপন্ন জাতির কুড়াল ঈগল, পালাসি কুড়া, ঈগল, গুটি ঈগল, ফিস ঈগলসহ বিভিন্ন প্রজাতির স্থলচর জলচর ও উভচর পাখির দেখা মিলে। জলজ উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় মাকনা পুঁটি, হিঙ্গাজুর, হাওয়া। এছাড়া শাপলা শালুকতো আছেই।
পৃথিবীর বৃহৎ এই জলাধার এডভ্যাঞ্চারপ্রিয় মানুষদের ভ্রমণযাত্রার ষোলকলা পূর্ণ করতে পারে। নৌকা দিয়ে হাওরের বুকে ভেসে যেতে দেখা মিলে নৌকার উপরে মাছ শিকারীদের ভাসমান জীবন। চাইলে হাওরের মাছ কিনে খাওয়া যায় এসব নৌকাতেই। মাঝিদের বললে তারাই নৌকার পাটাতনে অস্থায়ী উনুনে গরম ভাত রেঁধে দেয়। হাওরের জলের উপর ভেসে হাওরের তাজা মাছ খাওয়ার স্বাদ পেতে অনেকেই ছুটে আসেন এখানে।  বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে হাকালুকি হাওরে থাকে পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড়। হাওরের জলে ক্লান্ত সূর্যের অবগাহন দেখতে অনেকে সন্ধ্যা নামার আগে ছুটে যান। বিস্তৃত হাওরের জলে গোধূলির সূর্য ডুবার অপরূপ দৃশ্য যে কাউকে নিয়ে যাবে অন্য জগতে।