বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬

ফ্যাটেনিং বা গরু হৃষ্টপুষ্ট করনে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ডেল্টাটাইমস্, আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

/ কৃষি

ফ্যাটেনিং বা গরু হৃষ্টপুষ্ট করনে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা। বদলে দেবে পুরনো ধ্যানধারণা, বদলে দেবে বাংলাদেশ

প্রায় এক বছর হলো গরু হৃষ্টপুষ্টকরন বা ফ্যাটেনিং নিয়ে কাজ করছি। গরু হৃষ্টপুষ্টকরন একটি ভাল ব্যবসা হতে পারে এই লক্ষ্যকে বিবেচনায় এনেই মূলত আগানো। ফ্যাটেনিং নিয়ে কাজ শুরুর আগে একটা বিষয় মাথায় ঘুরতো বিদেশে ফ্যাটেনিং এর সিস্টেম আর আমাদের ফ্যাটেনিং সিস্টেম আলাদা কেন! অর্থাৎ বিদেশে গরুগুলোকে ছেড়ে পালে আর আমরা গলায় দড়ি দিয়ে টাইট করে বেধে বছর ধরে পালতে থাকি।

প্রশ্ন জাগে আমরা কেন এমন বেধে পালি? নিজ থেকে উত্তর পেলাম আমাদের দেশে ছেড়ে পালার মত জায়গা কম, তাই সবাই বেধে পালে। কিন্ত যাদের ছেড়ে পালার মত জায়গা আছে তারাও বা কেন বেধে লালন পালন করছে!

নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর পেলাম এটা একটি গতানুগতিক ধারার মত করে চলে আসছে। নতুন খামারিদের যে যেভাবে পরামর্শ দিচ্ছে তারা সেভাবেই করছে।

ফ্যাটেনিং এর শুরু থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে আমি গতানুগতিকের বাইরে কিছু করবো। যেহেতু আমার ছেড়ে পালার মত পর্যাপ্ত জায়গা আছে তাহলে দেখিনা একটা বছর কেমন হয়।

আমার দুজন বন্ধু আছে একজন আমেরিকার টেক্সাসে থাকে এবং আরেকজন থাকে কেনিয়াতে। ওদের সাথে ফ্যাটেনিং এর খুটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম।

আমি আমার দেশের খামারের ছবি ওদের পাঠাতে শুরু করলাম, ওরাও ওদের দেশের খামারের ছবি আমাকে পাঠাতে শুরু করলো। এক সময় টেক্সাসের বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করলো তোমরা এভাব আটকে কেন লালন পালন করো? আমি বললাম এভাবেই তো সবাই করে আমাদের দেশে।

বন্ধুটি বললো, ওদের প্রান আছে জীবন আছে। ওদের জীবনে ও আনন্দ খেলা ধুলা দরকার যা তুমি দিচ্ছোনা। আমাকে পরামর্শ দিলো যদি আমার পর্যাপ্ত জায়গা থাকে যেন গরু ছেড়ে পালি।

আমি বললাম আমার তো তোমাদের মত এত জায়গা নেই। টেক্সাসে ২ একর জায়গায় ২ টি গরু লালন পালন করে। আমি এত বড় জায়গা কোথায় পাবো?

বন্ধুটি বললো, তুমি চেস্টা করো তাহলে অল্প জায়গাতেই ছেড়ে পালতে৷ তাতেও গরুগুলো মনে প্রান সঞ্চার হবে। ভাল লাগলো ওর পরামর্শ শুনে।
মনে মনে ভাবছিলাম বিদেশী বন্ধু পরামর্শতো দিলো আমাদের দেশে কেমন হবে আল্লাই জানে। আমাদের দেশতো আর বিদেশ নয়!

তাই পরীক্ষামূলক ভাবে একেবারে কম খরচের মধ্যে বাশ দিয়ে ঘেরাও করে টিন দিয়ে কোন রকম একটি ঝুপড়ি বানিয়ে ১৫ টা গরুর জন্য জায়গা নির্ধারন করে কাজ শুরু করে দিলাম। মনে মনে টেনশন কেউ তো এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এভাবে ছেড়ে গরু লালন পালন করেনি, পরামর্শ দেবার মতও কেউ নেই আমাদের দেশে। তাই লক্ষ্য ছিল যত কম বিনিয়োগ করে পরীক্ষামূলক কাজটা করা যায়।

ছেড়ে পালার ব্যাপারে সে আমাকে দুটি পরামর্শ দিয়েছিলঃ এক) গরুগুলো যে জায়গায় আরাম করবে সে জায়গাটা যেন শুকনো এবং উচু থাকে। দুই) জাত নির্বাচন করতে হবে শাহীওয়াল/সিন্ধি/গীর এই জাতীয় গরুগুলোকে।

আমি ৫০ টা গরু দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যাটেনিং এর কাজ শুরু করি গত বছর ২০১৮ সেপ্টেম্বর মাসের দিকে।

৫০ টা গরুর জন্য ২ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হলো, কেনা হলো একটি লাইভ ওয়েট স্কেল যেন ১৫ দিন পর গরুগুলোর ওজন দিতে পারি, খড় কাটার মেশিন। ড্রাম কেটে এংগেল দিয়ে বানানো হলো খাবার পাত্র।

আমার জানার বিষয় ছিল দুটি। এক) গরুগুলোর রেশন কি হবে দুই) বৃষ্টির সময় কাদার মধ্যে কি অবস্থা দাঁড়াবে।

একদিন ফোন করলাম বন্ধুদের এই বিষয়ে জানার জন্য। প্রথম প্রশ্ন করার পরে বন্ধুরা উত্তরে বললো দ্রুত গ্রোথ আনার জন্য ভাল প্রোটিন সমৃদ্ধ দানাদার খাদ্য এবং রাফেজের জন্য আলফালফা বা ডিসমোডিয়াম জাতীয় ঘাস দেবার জন্য।

আমার তো এই জাতীয় রাফেজ নেই। আমাদের দেশে পাওয়া যায় খড় ও ঘাস। এই কথা শোনার পরে বললো অসুবিধা নেই দেয়া যেতে পারে; এমনকি যদি ঘাসের অভাব থাকে একটি ষাড় গরুকে ৫০% খড় + ৫০% ঘাস দেয়া যেতে পারে সাথে দানাদার খাবার তো থাকবেই।

খুব আশ্চর্যজনক একটা পরামর্শ দিলো টেক্সাসের বন্ধু সেটি হলো, যদি একেবারেই ঘাস না থাকে ষাড় গরুগুলোকে শুধু খড় ও দানাদার খাদ্য দিয়েই সুন্দরভাবে লালন পালন করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই দানাদার রেশন পুষ্টিমান সমৃদ্ধ হতে হবে।

আমি তো শুনে অবাক, বলে কি! ঘাস ছাড়া ষাড় গুলো পালন মানুষতো পাগল বলবে আমাকে।

আমি ৩ টা ভাগে ভাগ করলাম গরুগুলোকে। ১৫ টা পাঠালাম বেধে পালার জন্য যেখানে ঘাস+খড়+দানাদার থাকবে। ২০ টা সেট করলাম ছেড়ে পালার জন্য শুধু খড়+দানাদার দিয়ে, বাকী ১৫ টা সেট করলাম ছেড়ে পালার জন্য ঘাস+খড়+দানাদার দিয়ে পালার জন্য।

দানাদার খাদ্যের রেশন কি হবে জানতে চাইলে প্রথমেই বললো অনেক অনেক আইটেম দেবার প্রয়োজন নেই, চেস্টা করতে হবে যে টুকুই দিবা সেটুকু যেন ভেজাল মুক্ত থাকে এবং গরুর দেহের জন্য যে পুষ্টি গুনাগুন দরকার তা যেন থাকে।

আমি খাদ্য ম্যানুতে গমের ভুষি, ভুট্টা, সয়াবিন মিল ও রাইস ব্রান সেট করলাম সাথে ইস্ট এবং মোলাসেস। খড় এবং ঘাস পরিমান মত দিতে থাকলাম। কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম গরুগুলো খুব বেশী খড়/ঘাস খায়না।

খেয়াল করে দেখলাম যে গরুগুলো খড় খায় সেগুলো সারাদিনে প্রতিটা এভারেজ ২ থেকে ২.৫ কেজি খড় খায়, এর বেশী না।

আমার খুব চিন্তা হতে লাগলো এত কম খড় খেলে পেট না ভরলে কি করে চলবে! বন্ধুকে ফোন দিলাম সে শুনে হাসতে লাগলো। বললো, এটা কোন সমস্যাই নয়, ওদেরকে তুমি পুষ্টিমান খাদ্যের নিশ্চয়তা দাও, ৩ মাস পরপর কৃমিমুক্ত করো শুধু, আর কিছু চিন্তা করতে হবেনা।

আমি শুনে বললাম বলো কি তুমি! সে বললো, তুমি যখন জীমে যাও তোমাকে কি ইন্সট্রাকটর পেট ভরে খেতে বলে নাকি বলে পুষ্টিমান খাদ্য খেতে? আমি বললাম পুষ্টিমান খাদ্য অল্প অল্প করে খেতে। ও বললো ওদের স্বাস্থ্য কি খারাপ তোমার থেকে? হাহাহা, নাহ একেবারেই না। তো বুঝেছো এখন তুমি। পেট গাদায়ে পেট ফুলায়ে ষাড় গরুকে খাওয়ালে তোমার মত ভুড়ি, পেট ঝুলে যাবে যা দেখতে একেবারে ভাল লাগবেনা। বডি থাকতে হবে ফিট আর্নল্ডসোয়াজনেগারের মত।

এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করলো গ্রোথ কেমন আসছে। আমি ওকে ২ মাসের গ্রোথের রেকর্ড পাঠালাম। প্রতিটা গরু এভারেজ ১ কেজি ওজন বেড়েছে। কোনটা কোনটা দেড় কেজি পর্যন্ত বেড়েছে। শুনে বললো৷ ঠিক আছে চালিয়ে যাও।

এভাবেই চলছে চলছে.... সামনে কিছুদিন পর আসতেছে বর্ষাকাল। মাথাতো ঘুরতেছে কি হবে বর্ষাকালে। কাদার মধ্যে তো গরু গুলোর পায়ে ঘা/ক্ষত হয়ে যাবে, বাচানোই কঠিন হয়ে পড়বে হয়তো। টেনশনে পড়ে গেলাম.....

আবার একদিন ফোন দিলাম সময় সুযোগ বুঝে কি করবো কাদা হলে। ও বললো তুমি কোন টেনশন করোনা কাদায় গরুর কোন সমস্যা হবেনা। আমি বললাম পায়ে ঘা/ক্ষত হবেনা? ও হেসে বললো কিচ্ছু হবেনা, ভয়ের কিছু নেই।

বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেলো চারিদিকে কাদা আর কাদা। টেনশনে আমার ঘুম নেই। বন্ধুকে ফোন দিলাম, ছবি পাঠালাম কি হবে আমার এই গরু গুলোর। ও ছবি দেখে একটাই পরামর্শ দিলো ওদের রেস্ট করার জায়গাটা যেন শুকনো এবং উচু থাকে। সামনের জায়গায় কাদা থাকলে কোন সমস্যা নেই, কোন ঘা বা ক্ষত হবে না পায়ে।

ওর কথামত ৩ মাস কেটে গেলো এই ভাবে কাদার মধ্যে। অনেক সিনিয়র ভেটেরিনারি, অভিজ্ঞ খামারিরা আমাকে অনেকে পাগল বলা শুরু করলো। অনেকে বিশ্বাসই করতে চায়না এভাবে আসলেই সম্ভব গরু পালা। ২০ বছর ধরে পরামর্শ দেয় খামার করার ব্যাপারে এমন একজনের সাথে শেয়ার করার পরে সেতো মোটামুটি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলো খামারিরা আবার কিছু জানে নাকি!

আল্লাহ কাছে শুকরিয়া ছবিতে যে গরুগুলো দেখছেন লক্ষ্য করুন তাদের সু-স্বাস্থ্য এবং পারিপার্শ্বিকতা। হ্যা ওদের কষ্ট হয়েছে কাদার মধ্যে হাটতে, ওরা হয়তো বেশীর ভাগ সময় সেডেই কাটিয়েছে কিন্তু কাদার মধ্যে ওদের আনন্দ ফূর্তিও কম ছিলনা। যখন মনে হয়েছে কাদায় নেমেছে, সেডের ভেতরে রেস্ট করেছে।

পায়ে কোন প্রকার ঘা বা ক্ষত বা কোন স্কীন ডিজিজ দেখা দেয়নি। অসাধারন গ্রোথ তাদের মাশা আল্লাহ। আমি এই পোস্টের মাধ্যেম দায়িত্ব নিয়েই আজকে বলছি ভয়ের কোন কারন নেই পায়ে কোন ঘা বা ক্ষত হবে না কাদা থেকে। ক্ষুরা রোগের ভ্যাকসিন অবশ্যই দিয়ে দিবেন।

এই পুরো বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য হলো আমি যত কম খরচে গরু পালন করবো, আমার সাথে খরচের হিসাবে আপনি পারবেন না। কারন কি তা বলছিঃ

আমার গরুগুলো ছেড়ে পালার কারনে বর্ষাকাল বাদে অন্য সময় একেবারেই গায়ে কাদা থাকেনা। মাসে একবার গোসলই যথেষ্ট। এই বুদ্ধিটাও আমার বন্ধুর দেয়া। ও শুনে হেসেছিল কেন আমরা গরুকে ২/৩ বার গোসল করাই। ওরা শুধুমাত্র কোন শো-তে গরুকে স্টেজে উঠানোর আগে গোসল করায় এছাড়া কখন ও গোসল করায় না।

তাহলে বলুন, যে বেধে গরু পালে বিদ্যুৎ খরচ পানির খরচ তার বেশী হবে নাকি আমার? আপনার যা হবে তার জাস্ট ১/৪ (চার ভাগের একভাগ) হবে আমার৷ লেবার খরচ ব্যাপারে বলতে গেলে আমি দেখেছি ৫০ টা গরু না, মিনিমাম ১০০ গরু পালন করতে পারবে ২ জন লেবার। সারাদিনে মেশিনে খড় কাটা, দানাদার খাদ্য দেয়া এবং সকালে গোবর পরিষ্কার করা এইটুকুই তাদের কাজ সারাদিনে সর্বোচ্চ ৩/৪ ঘন্টার।

কি অবিশ্বাস্য মনে হয়? না আসলেই সত্যি।

তবে ছেড়ে গরু পালার জন্য গরুর বয়স এবং কিছু সিস্টেম ফলো করতে হবে। গরুর বয়স হতে হবে কম, দাত উঠেনি এমন গরু এবং মনে রাখতে হবে যখন কোন রেঞ্চে গরু ছাড়বেন তখন একবারে সব গুলোকে ছেড়ে দিতে হবে।

মানে হলো, একটা রেঞ্চে আজকে ৫ টা ছাড়লেন আবার এক সপ্তাহ পরে আবার ছাড়লেন এমনটা কোন ভাবেই করা যাবেনা। এক সপ্তাহ পরে ছাড়লে আগের গুলো কোনভাবেই নতুনগুলো মেনে নেবেনা তাদের রেঞ্চে। ফলে মারামারি করবে, ভাংচুর করবে যা আপনি সামাল দিতে পারবেন না। কথাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে রাখবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যারা শুকনা গরু কিনে ৪ মাস মেয়াদী প্রজেক্ট করবেন তারা অবশ্যই গরু ছেড়ে পালবেন না। আপনাদের অবশ্যই গরু আটকেই পালতে হবে। ছেড়ে পালা হবে তাদের জন্য যারা ৮ মাসের উপরে প্রজেক্ট করবেন।

এই কথাগুলো আপনি কোন বইয়ে পাবেন না, কেউ আপনাকে ব্যাবসার এই সিক্রেটগুলো বলবেও না। আবার ছেড়ে পালার ব্যাপারে এ দেশে আপনাকে কেউ সঠিক পরামর্শ ও দিতে পারবেনা আপনাকে। কারন ছেড়ে পালা নিয়ে আজ পর্যন্ত এভাবে আমার থেকে বেশী কেউ পরীক্ষামুলোকভাবে কাজ করেনি।

যা কিছু লিখেছি সব কিছু বাস্তবে আমার হাতে কলমে কাজ করে নিজে শিখে শেয়ার করলাম আপনাদের জন্য। আল্লাহ চায়তো এমন কিছু দেশে হবে যা অতীতে আগে কোনদিন হয়নি। আমরাই পরিবর্তন আনবো এদেশে দুগ্ধ ও মাংস শিল্পে সকলের সহযোগিতায়।

এই দেশকে মাংস শিল্পে স্বয়ং সম্পূর্ন করতে হবে আমাদের। দেশের জনগনকে কম মূল্যে মাংস দিতে হবে আমাদের। মাংস বিদেশে রপ্তানী করতে হবে আমাদের। আমি বিশ্বাস করি এদেশের শিক্ষিত খামারি ভাইরে মাংস ও দুগ্ধ শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে ছাড়বে। ভয়ের কিছু নেই, আমরা আছি আপনাদের সাথে সকল সহযোগিতায়।