শনিবার ২৬ নভেম্বর ২০২২ ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

নৌ-দুর্ঘটনার শোকের মাতম শেষ কোথায়
ইসরাফিল আলম রাফিল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৩:৫৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

নৌ-দুর্ঘটনার শোকের মাতম শেষ কোথায়

নৌ-দুর্ঘটনার শোকের মাতম শেষ কোথায়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০০ টি বেশি নদী রয়েছে। নদীর সাথে এদেশের মানুষকে জীবন-জীবিকার সম্পর্ক। দেশের এখনো ৩০ শতাংশের বেশি লোক নদীপথ ব্যবহার করে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহর, নগর ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলো নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে নৌপথই গণপরিবহন প্রধান মাধ্যম। সেসব এলাকার মানুষের এখনো নৌ-পথই যোগাযোগের অন্যতম অবলম্বন।

আমাদের দেশে হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ-দৃশ্য নৌকাডুবি ও নৌযানের ধাক্কা ঘটনায় মৃত্যু এমন সংবাদ প্রায়ই শুনতে পাই। নৌযানের সাথে ধাক্কা,সংঘর্ষ ও ধারণক্ষমতা বেশি যাত্রী নেওয়ার ফলে ঘটছে এমন মারাত্মক নৌ-দুর্ঘটনা। বেপরোয়াভাবে লঞ্চ, ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালানো ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু মিছিল পর্যন্ত শেষ হয়ে যায় না৷ দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারের কান্না শোকের মাতব যেনো শেষ নেই। কারো পরিবারের উপার্জন কর্মক্ষম বাবা,কারো মা, কারো ভাই -বোন। একই পরিবারের একাধিক সদস্য  নৌকাডুবি ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এমনও রয়েছে। নৌ-দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যু মিছিল পরেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বহীনতা হতাশ করছে আমাদের।

সম্মতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েরা বামনহাট ইউনিয়নে করতোয়ায় নৌকা ডুবে এখন পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যু ও ৪২ জন নিখোঁজ খবর পাওয়া গেছে। শীতলক্ষায় কার্গোর ধাক্কায় শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবে যাওয়া। লঞ্চে ভয়াবহ আগুনে মৃত্যু ৪১ জন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রলার ডুবিতে ২২ জনের মৃত্যু মতো হৃদয়বিদারক সংবাদ দেখেই চলছি।

দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের আহাজারি দেখার যেনো কেউ নেই। শোকাহত পরিবারদের সান্তনা দেয়ার মত ভাষা নেই। দেশের নৌ-দুর্ঘটনা এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলন পরিসংখ্যান বলেছে ২০২০ সালে সারাদেশে ৭০ টি বেশি দুর্ঘটনায় ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা কারণ হিসেবে সংঘর্ষ ও ধাক্কা ও ধারণক্ষমতা বেশি যাত্রী নেওয়াকে দায়ী করেছে তদন্ত কর্মকর্তারা।

নৌ-দুর্ঘটনা পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর। ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নৌ-দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশ ঘটেছে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত যাত্রী  পরিবহন ২৫ শতাংশ  ও বৈরী আবহাওয়া কারনে ২৩ শতাংশ। এছাড়া আগুন ও বিস্ফোরণের কারণে ৬ শতাংশ বাকি ৩ শতাংশ নৌযানে তলা ফেটে গিয়ে দুর্ঘটনা হয়েছে। এছাড়াও ডিপার্টমেন্টে অব শিপিং (ডিওএস) বাংলাদেশের অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনার পেছনে এক যানের সাথে অন্য যানের সংঘর্ষকে দায়ী করেছে। দুর্ঘটনাগুলোর কারণ ভিন্ন হলেও এক্ষেত্রে অনেক সাধারণ কারণও লক্ষণীয়। এগুলো হলো—  চালকদের বেপরোয়া গতি, যন্ত্রাংশে ত্রুটি, নৌ-যানের ত্রুটিযুক্ত গঠন, অনিরাপদ নৌ রুট, নৌ-যানের ফিটনেস, লাইসেন্সবিহীন অপারেটর, রাডার বা রেডিও সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা, অত্যধিক স্রোত,  নজরদারি  ঘাটতি,  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগহীনতা ইত্যাদি।

নৌ- দূর্ঘটনা মতো হৃদয়বিদারক আর কিছু হতে পারে না। দূর্ঘটনায় স্বীকার স্রোতের কারণে কখনো নদীতে লাশ পাওয়া যায় না। আপনজন হারানো বেদনা এতো নিষ্ঠুরতম হয় শেষ সময়ে একবার দেখে বিদায় জানাতে পারে না পরিবার গুলো। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ৯০ শতাংশ নৌ-দূর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তি আর খোঁজে পাওয়া যায় না।  নৌযানের নিরাপত্তা জোরালো করতে অরক্ষিত নৌপথে শৃঙ্খলা আনতে হবে।
 
প্রতিটি নৌযানের রেজিষ্ট্রেশন ও নৌযানের শৃঙ্খলা ফেরাতে নকশা ও ডিজাইন অনুমোদন প্রয়োজন। নৌ পরিবহন অধ্যাদেশ আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে  বিচার কার্য পরিচালনা করতে হবে। কোনো নৌ-দুর্ঘটনা হলে গুরুত্বের সাথে তদন্ত সহ ভ্রাম্যমান নৌ-আদালত পরিচালনা করে এর কার্যক্রম মনিটরিং জোর দেওয়া প্রয়োজন। আইন অমান্যকারী নৌযান মালিক বিরুদ্ধে মামলা যথাযথ ব্যবস্থা নিলে নৌপরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

দেশের নৌ-পথ দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে সরকার নৌ-পথের উন্নয়নে বিনিয়োগ করলেও এই খাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা কারণে নৌ-পথের যাত্রীদের নিরাপত্তা বরাবরই উপেক্ষিত হচ্ছে। নৌ-দূর্ঘটনায় নিহত পরিবারদের ক্ষতি পূরণ দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রশাসনের নজরদারি পাশাপাশি ট্রলার,কার্গোর ও নৌকা চালকের প্রশিক্ষিত হতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। দূর্যোগের আভাস পেলে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। চালকের পাশাপাশি যাত্রীদের সর্তক থাকতে হবে, ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে উঠা থেকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি নৌ-পথ যাত্রা নিরাপদ হোক এটাই কাম্য।


লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


ডেল্টা টাইমস্/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]