বৃহস্পতিবার ২০ জানুয়ারি ২০২২ ৫ মাঘ ১৪২৮

চরিত্র হারালো তো সব গেল
রহমান মৃধা
প্রকাশ: বুধবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২১, ১:২১ পিএম আপডেট: ২৭.১০.২০২১ ১:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

চোখ প্রাণিজগতের আলোক-সংবেদনশীল একটি অঙ্গ ও দর্শনেন্দ্রীয় যা আলোর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির পার্থক্য করতে পারে। প্রাণির চোখের মণি যেমন দেখতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঠিক ব্ল্যাক হোলকে দেখে মনে হবে আলোকরশ্মির মধ্যে কালো একটি চোখের মণি যাকে ফাঁকি দেবার শক্তি নাকি আলোরও নেই।

অনেকেরই ব্ল্যাক হোল নামটির সঙ্গে নতুন পরিচয় ঘটেছে। ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং এতই প্রখর যে তার হাত থেকে কোনোকিছুই পালাতে পারে না, এমনকি আলোররশ্মিও না।


এর নাম ব্ল্যাক হোল বলা হলেও আসলে এটা ফাঁকা নয় বরং এতে বিপুল পরিমাণ পদার্থ জমাট বেঁধে আছে। যার ফলে এর মহাকর্ষশক্তি এত জোড়ালো। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসানো আটটি রেডিও টেলিস্কোপের এক নেটওয়ার্ক দিয়ে ব্ল্যাক হোলের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। ছবিটি দেখলে মনে হবে বৃত্তাকার কালো আভার চারদিকে এক উজ্জ্বল আগুনের বলয়।

জানা গেছে, পৃথিবী থেকে এই ব্ল্যাক হোল ৫০ কোটি ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে এবং এটার ভর (এর মধ্যেকার পদার্থের পরিমাণ) সূর্যের চেয়ে ৬৫০ কোটি গুণ বেশি। ব্ল্যাক হোলটি এতই বড় যে এটাকে একটা দানব বলে বর্ণনা করছেন বিজ্ঞানীরা। 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দানবাকৃতির এই ব্ল্যাক হোল পৃথিবী যে সৌরজগতের অংশ তার চাইতেও বড়। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এর আয়তন ৪ হাজার কোটি কিলোমিটার যা পৃথিবীর চেয়ে ৩০ লাখ গুণ বড়। এখন দানব কী বা তা দেখতে কেমন বা কত বড় সেটা কি আমরা জানি? ভাবনার বিষয় কী হবে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে জেনে বা আমাদের কী উপকারে আসতে পারে এটা!

আদার বেপারী হয়ে জাহাজের খবর নেয়া কথাটি অতীতে যেভাবে বলা হতো এখন কিন্তু সেভাবে বলা ঠিক হবে না। কারণ বস্তা বস্তা আদা এখন জাহাজে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বলা যায় না কখন দেখা যাবে ব্ল্যাকহোল মানবকল্যাণে এমনভাবে কাজে লাগবে যে হয়তোবা দুর্নীতি, অনীতি, কুকর্ম বা ধর্ষণ কিছুই করা যাবে না। 

ব্ল্যাকহোলের কাছ থেকে যখন কোনোকিছুই পালাতে পারে না, এমনকি আলোর রশ্মিও। তাহলে আমাদের ভালো-মন্দ কর্মের সব কিছুই কি ব্ল্যাক হোলে ধরা পড়ছে না?

আমি পড়েছি বেশ চিন্তায়। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনও তাদের দিনের খাবার জোগাড় করতে সক্ষম হয়নি, আবার কেউ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান দিচ্ছে!

অন্যদিকে অনেকে মতামতের অমিলে ধৈর্য এবং সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে অন্যের দেহ থেকে মাথা সরিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না। আমরা নিজেদের মধ্যে ঘৃণার বীজ বপন করে প্রতিহিংসার জন্ম দিচ্ছি। ক্ষমতা ধরে রাখতে উঠে পড়ে লেগে আছি।

একই সময় পাশ্চাত্যে কী দেখছি?
ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবার চিন্তাভাবনা করছেন। কারণ যে বেতন তিনি পান সেটা তার অতীত ইনকামের চেয়ে কম এবং বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আগে একটি পত্রিকায় কলাম লিখে তিনি নাকি বছরে আয় করতেন ২ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড। এছাড়া মাসে দু’টি সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে তিনি আয় করতেন ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডের কাছাকাছি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার উপার্জন কমে গেছে।
বাংলাদেশে কি কখনও এমনটি হতে পারে বা ভাবা যেতে পারে?

সুইডেনে প্রায়ই এমনটি দেখা যায়। বেশি দিনের কথা নয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মডারেট পার্টির লিডার এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী দুজনেই তাঁদের দায়িত্ব ছেড়ে অন্যখানে চাকরি নেন। কারণ রাজনীতি এসব দেশে অন্যান্য কাজের মতোই। ভালো না লাগলে বা অন্য কোথাও ভালো বেতন পেলে অনেকে চাকরি ছেড়ে দেয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে। কারণ পাশ্চাত্যে কোনো দেশে রাজনীতিবিদদের প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাই করার সুযোগ নেই। তাদেরকে সচরাচর দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেখা যায় না।

মূলত দেশসেবা করার জন্যই এরা এ কাজে আসে। যদি সেটা মনপূত না হয় তখন আস্তে করে সরে যায় এ পেশা থেকে।
কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টি কেন যেন একটু ভিন্ন ধরনের। আমাদের মাইন্ডসেট বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভিন্ন। এত বড় ব্যবধান? ভাবতেই গা শিউরে উঠে!

সুইডেন সহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে শীতকালে যখন বরফ পড়তে শুরু করে তখন গাড়ির চাকা (tires) চেঞ্জ করতে হয়। এই শীতের চাকাকে winter tires বা studded tires  বলা হয়। সুইডেনে শীতের চাকা চেঞ্জ করার সময় ১ অক্টোবর -১ ডিসেম্বর। প্রতি বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে মার্চের ৩১ তারিখ পর্যন্ত (winter tires) শীতের চাকা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। সুইডিশ ভাষায় গাড়ির চাকা বা টায়ারকে বলা হয় ডেক (däck)। এখানে তিন ধরনের টায়ার গাড়িতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সামার ডেক, উইন্টার ডেক এবং ডুব ডেক (dubb däck)। শীতে রাস্তা বরফে ঢাকা থাকার কারণে উইন্টার বা ডুব ডেক ব্যবহার করা হয়ে থাকে, বরফে এক্সিডেন্ট বা স্লিপারির আশংকা থেকে রক্ষা পেতে। ডুব ডেক তৈরিতে পেরেক ব্যবহার করা হয় টায়ারের নিচে, যাতে করে টায়ারের পেরেক বরফে ঢুকে যেতে পারে যদি স্লিপারি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।(dubb däck attach better because the studs move up the tracks in the ice)।

আজ  সকালে শীতের চাকা চেঞ্জ করতে গাড়ির মিস্ত্রির কাছে এসেছি। ওয়েটিং রুমে বসে আছি, হঠাৎ টিভিতে নজর পড়ল একটি প্রোগ্রামের দিকে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে সুইডেনে দেহের অর্গান চেঞ্জ করার ওপর।কিভাবে একজনের দেহের পুরো হার্ট প্রতিস্থাপন (heart transplantation) করা হয়েছে তা দেখলাম। প্রযুক্তির যুগে শরীরের বেশির ভাগ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অকেজো হলেই তা প্রতিস্থাপন (transplant) করা কোনো কঠিন বিষয় নয় সুইডেনের হাসপাতালে। অথচ ছোট খাটো রোগ যেমন ঘুমের ঘোরে ক্র্যাম্পের কারণে পায়ে ব্যথা বা স্ট্রেসের কারণে অনেকে মানসিক অশান্তিতে দীর্ঘদিন ভুগছে যার আশানুরূপ চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

গা শিউরে উঠছে এবং মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে আমরা অর্থে গরিব, মহাশূন্যের তথ্য জানার মতো সুযোগ সুবিধা আমাদের নেই। তবে হাসপাতালে প্রতিদিন নানা ধরণের রুগী নানা ধরণের রোগ নিয়ে হাজির হয়। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালে আসে। এখানকার ইমারজেন্সি আর বাংলাদেশের ইমারজেন্সি আকাশ পাতাল তফাৎ, যদি তুলনা করি। কারণ যে স্ট্রেস নিয়ে বাংলাদেশের ডাক্তাররা কাজ করে তা কখনও এখানে দেখা যায় না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডাক্তাররা যে অভিজ্ঞতা পায় তা পাশ্চাত্যের ডাক্তাররা পায় না।

তারপরও এরা যা জানে, শেখে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে সেই অর্জনে খ্যাতনামা ডাক্তার এবং হাসপাতাল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আমরা সেভাবে প্রশিক্ষণকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারছি না। বরং নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই করে চলছি। গাড়ির কোনো পার্টস নষ্ট হলে তা পাল্টে নতুন একটি পার্টস চেঞ্জ করলেই গাড়ি যেমন সমস্যা ছাড়া চলতে শুরু করছে ঠিক একইভাবে সুইডেনের হাসপাতালে গেলে শরীরের অকেজো অর্গান চেঞ্জ করা হচ্ছে বর্তমানে। বলা যেতে পারে গাড়ির মতোই মেরামত করা হচ্ছে আমাদের শরীরকে।

টিভি প্রোগ্রামটি দেখে বাইরে যেতে দেখি তিনজন ছেলে বিল্ডিংয়ের মেইন (main) দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। দরজা খুলেই জিজ্ঞেস করলাম তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছো কেন? এখানেই বা তোমরা কী কারণে এসেছ?
একজন বললো আমি কাজে এসেছি অন্য দুজন সঙ্গে এসেছে। আমি বললাম কার কাজে এসেছো এবং কেনই বা সিগারেট টানছো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে? ভালো করেই জানো যেখানে সেখানে সিগারেট টানা নিষেধ, তা সত্ত্বেও কেন এ কাজ করা হচ্ছে? কত বছর এখানে আছো এবং কোন দেশ থেকে এসেছো? একজন সোমালিয়া এবং অন্য দুজন ইরান থেকে এসেছে। ১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বসবাস করছে সুইডেনে।

বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর বললাম নিজেদের দেশে থাকতে পারনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে। অথচ এরা তোমাদের সমস্ত ভরণপোষণসহ দায়িত্ব নিয়েছে, তার প্রতিদান যদি এমনটি হয়, তখন সুইডিশ জাতি সব বিদেশিকে ঘৃণা করতে শুরু করবে। বিনিময়ে আমরা হয়তো বলবো এরা বর্ণবাদী (racist)। শেষে তারা তর্ক ছেড়ে সিগারেটের নির্বাপণ (stub out) তুলে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে চলে গেল। জানিনা শিক্ষণীয় কিছু সঙ্গে নিয়ে গেল কিনা!

আমি গাড়ির চাকা চেঞ্জ করে চলে এলাম। পথে যেতে যেতে টিভির প্রোগ্রামের কথা মনে পড়ে গেল। ভাবনায় ঢুকেছে শরীরের সমস্ত অর্গান চেঞ্জ করা যতো সহজ, স্বভাব চেঞ্জ করা যদি ততো সহজ হতো তাহলে পৃথিবীর অনেক সমস্যার সমাধান করতে কতই না সহজ হতো।

হার্ট চেঞ্জ, সমস্ত অর্গান চেঞ্জ করা সম্ভব কিন্তু চরিত্র পরিবর্তন সম্ভব নয় যদি শুরু থেকে সেটা সঠিকভাবে গঠন করা না হয়। তাই আমি মহশূন্যের ব্ল্যাক হোলের মতো নতুন কিছু ভাবছি না। আমি আমাদের হৃদয়ের ব্ল্যাক হোলের কথা ভাবছি, এর কি পরিবর্তন করা সম্ভব?

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক 
(প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট)
ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]




ডেল্টা টাইমস্/রহমান মৃধা/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]